1. jashimsarkar@gmail.com : admin :
  2. fatama.ruma007@gmail.com : Fatama Rahman Ruma : Fatama Rahman Ruma
  3. anikbd@germanbangla24.com : Editor : Editor
  4. rafid@germanbangla24.com : rafid :
  5. SaminRahman@germanbangla24.com : Samin Rahman : Samin Rahman

করোনা উপদ্রবের মধ্যে দেশজুড়ে বন্যার থাবা

শামস্ রহমান, বাংলাদেশ
  • প্রকাশের সময়: বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই, ২০২০
Check for details

শামস্ রহমান : করোনায় সারা দেশ যখন পর্যুদস্ত, ঠিক তখনই নতুন উপদ্রব হিসেবে দেখা দিয়েছে বন্যা। প্রতিদিন কোনো না কোনো নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত করছে। রাজধানী ঢাকার চারপাশের নদীগুলো এখন নতুন পানিতে থইথই, ক্রমশ ঢাকাকে বন্যার পানিতে ঢেকে দিতে উদ্যত। দীর্ঘ ১৬ বছর পর রাজধানীতেও ঢুকছে বন্যার পানি।

গত ২৬ জুন থেকে বাংলাদেশে শুরু হয় বন্যা। প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপের বন্যাদুর্গতরা এখনো অনেকে বাড়িঘরে ফিরতে পারেননি। এর মধ্যে গত ২১ জুলাই থেকে টানা বর্ষণ আর উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে তৃতীয় দফায় অব্যাহত আছে ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, পদ্মাসহ বাংলাদেশের প্রধান নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি। রাজধানী ঢাকার আশপাশেও ঢুকে পড়েছে বানের পানি। ঢাকার তীরবর্তী তুরাগ, বংশী, ধলেশ্বরীর পানি বেড়ে যাওয়ায় প্লাবিত সাভার ও ধামরাইয়ের নিম্নাঞ্চল। রাজধানীর পাশের জেলা মুন্সিগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে। টঙ্গীবাড়ী-ঢাকা মহাসড়কে পানি ওঠায় বিঘ্নিত হচ্ছে যান চলাচল। লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধাসহ ব্রহ্মপুত্র তীরবর্তী বেশির ভাগই তলিয়ে গেছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, এবার তৃতীয় ধাপের বন্যা দীর্ঘস্থায়ী হবে। বন্যায় মধ্যাঞ্চলে নদীভাঙায় দিশেহারা মানুষ। মিলছে না ভানবাসীদের প্রয়োজনীয় ত্রাণ। দু-এক জায়গায় বন্যাদুর্গতদের নগদ অর্থ সহায়তা দেওয়া হলেও ত্রাণ না পাওয়ায় হাহাকার পানিবন্দী মানুষের। বিশেষ করে, পদ্মা, যমুনাতীরের রাজবাড়ী, ফরিদপুর, শরীয়তপুর ও মাদারীপুরের মানুষের দুর্ভোগ চরমে উঠেছে। দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের হিসাবেই দেশের ৩৮ জেলায় ৫০ লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন।এদিকে বন্যাদুর্গত বিভিন্ন এলাকা থেকে ক্ষতিগ্রস্ত অনেকে বলেছেন, করোনাভাইরাসের প্রকোপের মাঝে বন্যায় তারা চরম অসহায় পরিস্থিতিতে রয়েছেন। বন্যা সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, রাজধানীর ঢাকার নিচু এলাকাগুলোর দিকে বন্যা ধেয়ে আসছে এবং মধ্যাঞ্চলের জেলাগুলোতে আরও অবনতি হচ্ছে। সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেছেন, করোনাভাইরাস এবং বন্যা-এই দুটি দুর্যোগ একসাথে মোকাবিলা করাটা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মধ্যাঞ্চলের জেলা ফরিদপুর, রাজবাড়ী, জামালপুর, নেত্রকোনা, মানিকগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, টাঙ্গাইল ও ঢাকার দোহার উপজেলায় প্রধান নদ-নদীর পানি এখনো বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে এসব জেলায় বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। তবে কোনো কোনো এলাকা নতুন করে প্লাবিত হয়েছে। উত্তরে গাইবান্ধা ও সিরাজগঞ্জে নদীর পানি কমলেও বন্যার উন্নতি হয়নি। সুনামগঞ্জেও বানের পানি কমছে ধীরগতিতে। পানিবন্দি পরিবারের সংখ্যা ১০ লাখ ছুঁই-ছুঁই। এতে উত্তর ও মধ্যাঞ্চলের বিস্তীর্ণ জনপদে বন্যার পানির সঙ্গে লড়ছে ৫০ লাখের বেশি মানুষ। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২৭ জুলাই সোমবার পর্যন্ত ৩১টি জেলা বন্যাদুর্গত হয়েছে। ১৫৩টি উপজেলার ৯০৮ ইউনিয়নে পানিবন্দি পরিবারের সংখ্যা ৯ লাখ ৮৪ হাজার ৮১৯। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ৪৭ লাখের বেশি মানুষ। ১০ জেলায় ৪১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এদের মধ্যে ৩৩ জনই শিশু। জামালপুরে ১৫ এবং কুড়িগ্রামে নয়জনের মৃত্যু হয়েছে। ১ হাজার ৬০৩টি আশ্রয়কেন্দ্রে ঠাঁই নিয়েছেন ৮৯ হাজার ৩০০ জন মানুষ এবং ৭৫ হাজার ৭০২টি গবাদিপশু। দুর্গত এলাকায় কাজ করছে ৩৮৫টি মেডিকেল টিম। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুজ্জামান ভুঁইয়া জানান, ঢাকার আশপাশের নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকতে পারে। ১৭ জেলায় ৩০টি পয়েন্টে নদ-নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে বইছে।

১৬ বছর পর রাজধানীতেও ঢুকছে বন্যার পানি : ১৬ বছর পর বন্যার পানি ঢুকেছে রাজধানীতে। ডুবে গেছে সিটি করপোরেশনের আওতাধীন বেরাইদ, সাঁতারকুল, গোড়ান, বনশ্রী, বাসাবো, আফতাবনগরের নিচু এলাকা। এ ছাড়া ডেমরা, যাত্রাবাড়ী ও ডিএনডি বাঁধ এলাকায়ও বন্যার পানি ঢুকতে শুরু করেছে। রাজধানীর আশপাশের বালু, তুরাগ ও টঙ্গীখালের পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। নদী বিশেষজ্ঞ এনামুল হক বলেন, পূর্বাঞ্চলে যত দিন বাঁধ নির্মাণ না হবে, তত দিন বন্যায় ভাসতে হবে রাজধানীবাসীকে। ১০ দিন ধরে পানিবন্দি ঢাকার পূর্বাঞ্চলের মানুষ। পানি বাড়ছে প্রতিদিনই। তার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে দুর্ভোগ। পানির তোড়ে ভেঙে গেছে ছোট ছোট বাঁধ, ভেসে গেছে মাছের ঘের। বালু নদীর পানি উপচে ঢুকে পড়েছে উত্তর ও দক্ষিণ সিটির বেশ কয়েকটি এলাকায়। বেরাইদের ফকিরখালীর প্রায় প্রতিটি বাড়িতে ঢুকেছে বানের পানি। সুপেয় পানির সংকটে এ অঞ্চলের কয়েক হাজার পরিবার। এলাকাবাসী বলেন, রাজধানীতে আমরা ৯৮-এর পর এত পানি দেখিনি। ডেমরা থেকে টঙ্গী বেড়িবাঁধ প্রকল্প বাস্তবায়িত না হওয়ায় আমাদের কষ্ট লাঘব হচ্ছে না।

পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত ৪ হাজারের বেশি : চলতি মৌসুমে তিন সপ্তাহের মধ্যে দুই দফা বন্যার মুখোমুখি হয়েছে দেশের উত্তর, উত্তর-পূর্ব ও মধ্যাঞ্চল। ১৮ জেলার নিম্নাঞ্চলে প্রায় ২৬ লাখ মানুষ দুর্গতিতে পড়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ন্যাশনাল হেলথ ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট সেন্টারের নিয়ন্ত্রণ কক্ষের সহকারী পরিচালক ডা. আয়শা আক্তার জানান, ৩০ জুন থেকে এ পর্যন্ত উপদ্রুত এলাকায় ডায়রিয়া, চর্মরোগ, চোখের প্রদাহ, শ্বাসনালির প্রদাহসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়েছেন ৪ হাজারের বেশি মানুষ। এছাড়া ডায়রিয়া, পানিতে ডুবে, সাপের কামড়ে ও বজ্রপাতে ৬৭ জনের মৃত্যু হয়েছে।

বাংলাদেশে প্রলয়ংকরী কয়েকটি বন্যা : ১৮২২ সালের বন্যায় বাকেরগঞ্জ বিভাগ ও পটুয়াখালী মহকুমা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ৩৯ হাজার ৯৪০ জন মানুষ ও ১৯ হাজার গবাদিপশু মারা যায়। ১৩ কোটি টাকার সম্পদ ধ্বংস হয়। বরিশাল, ভোলা ও মনপুরা দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
১৮৭১ সালে রাজশাহী ও আরো কিছু জেলায় ব্যাপক বন্যা হয়। শস্য, গবাদিপশুসহ জানমালের ব্যাপক ক্ষতি হয়। এটি ছিল রাজশাহীতে রেকর্ডকৃত এ-যাবৎকালের সবচেয়ে ভয়ংকর বন্যা।
১৮৭৬ সালে বরিশাল ও পটুয়াখালী দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মেঘনা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৬ দশমিক ৭১ মিটার উঁচু হয়ে গলাচিপা ও বাউফলের ব্যাপক ক্ষতি হয়। ২ লাখ ১৫ হাজার মানুষের জীবনহানি হয়। বন্যার অব্যবহিত পরে কলেরাতেও মানুষের মৃত্যু হয়।
১৯১৫ সালে ময়মনসিংহে তীব্র বন্যা হয়। ১৮৫৯ সালে ব্রহ্মপুত্র নদীর গতিপথ পরিবর্তনের কারণে তিস্তা নদীর যে বন্যা হয়েছিল, তার সঙ্গে সেই বছরের বন্যার ক্ষয়ক্ষতি ছিল সমান।
১৯৫৪ সালের ২ আগস্ট ঢাকা শহর পানির তলে নিমজ্জিত হয়। ১ আগস্ট সিরাজগঞ্জে যমুনা নদীর পানির উচ্চতা ছিল ১৪.২২ মিটার এবং ৩০ আগস্ট হার্ডিঞ্জ ব্রিজের কাছে গঙ্গা নদীর পানির উচ্চতা ছিল ১৪.৯১ মিটার।
১৯৫৫ সালে ঢাকা জেলার ৩০ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়েছিল। বুড়িগঙ্গা ১৯৫৪ সালের সর্বোচ্চ সীমা ছাড়িয়ে যায়।
১৯৬৬ সালে ঢাকা জেলার অন্যতম প্রলয়ংকরী বন্যাটি হয় ৮ জুন। ১৫ সেপ্টেম্বর ৫২ ঘণ্টা একনাগাড়ে বৃষ্টির ফলে ঢাকা শহর প্রায় ১২ ঘণ্টা ১.৮৩ মিটার পানির নিচে তলিয়ে ছিল।
১৯৮৭ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে বন্যায় বড় ধরনের বিপর্যয় হয়। প্রায় ৫৭ হাজার ৩০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয় (সারা দেশের ৪০ শতাংশের বেশি)। এ ধরনের বন্যা ৩০ থেকে ৭০ বছরে একবার ঘটে। দেশের ভেতরে ও বাইরে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতই বন্যার প্রধান কারণ ছিল। ব্রহ্মপুত্রের পশ্চিমাঞ্চল, গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র একীভূত হওয়ায় নিচের অঞ্চল, খুলনা এবং মেঘালয় পাহাড়ের সংলগ্ন অঞ্চল বন্যাকবলিত হয়।
১৯৮৮ সালের আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে বন্যায় ভয়ংকর বিপর্যয় নেমে আসে। প্রায় ৮২ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয় (সারা দেশের ৬০ শতাংশের বেশি)। এ ধরনের বন্যা ৫০ থেকে ১০০ বছরে একবার ঘটে। বৃষ্টিপাত এবং একই সময়ে (তিন দিনের মধ্যে) দেশের তিনটি প্রধান নদীর প্রবাহ একই সময় মিলিত হওয়ার ফলে বন্যার এই প্রলয়ংকরী রূপ দেখা দেয়। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা শহরও প্লাবিত হয়। সেই বন্যার স্থায়িত্বকাল ছিল ১৫ থেকে ২০ দিন।
১৯৯৮ সালের বন্যায় সারা দেশের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি এলাকা দুই মাসের অধিক সময় বন্যাকবলিত থাকে। বন্যার ব্যাপ্তি অনুযায়ী এ বন্যাকে ১৯৮৮ সালের বন্যার সঙ্গে তুলনা করা হয়ে থাকে।

শেয়ার করুন:
এই বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

ফেসবুকে জার্মানবাংলা২৪

বিজ্ঞাপন

Check for details