মেধাবীরা হারিয়ে যাচ্ছে সড়কে

Check for details

বিনয় দত্ত.

১.

“পাখিটা বন্দী আছে দেহের খাঁচায়
পাখিটা
ও তার ভবের বেড়ী পায়ে জড়ানো,
উড়তে গেলে পড়িয়া যায়
পাখিটা বন্দী আছে দেহের খাঁচায়,
পাখিটা” 

দেহের খাঁচায় প্রাণ পাখিটা আর বন্দী হয়ে থাকলো না। তাকে দেখার পরে, আঁখি আর জুড়াল না। প্রাণ পাখিটা নিজের বেড়ী ছিঁড়ে উড়ে গেল দেহের খাঁচা থেকে। দেহের খাঁচায় প্রাণ পাখিটাকে পোষ মানিয়ে রাখা গেল না। চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদ এবং গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব মিশুক মুনীরের দেহের প্রাণ পাখিটা উড়ে অচিনপুরে পাড়ি জমিয়েছে।

২০১১ সালের ১৩ আগস্ট মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার শালজানা গ্রামে ‘কাগজের ফুল’ চলচ্চিত্রের দৃশ্যায়নের স্থান দেখে মাইক্রোবাসে ঢাকায় ফিরছিলেন তারেক মাসুদ ও মিশুক মুনীরসহ কয়েকজন সহকর্মী। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের ঘিওর উপজেলার জোকা এলাকায় তাঁদের বহনকারী মাইক্রোবাসটির সঙ্গে বিপরীত দিক থেকে আসা চুয়াডাঙ্গা ডিলাক্স পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে তারেক মাসুদ ও মিশুক মুনীরসহ পাঁচজন ঘটনাস্থলেই নিহত হন। আহত হন ওই মাইক্রোবাসে থাকা কয়েকজন।

এই ঘটনা আমাদের কাঁদিয়েছে, কাঁদিয়েছে গোটা বিশ্বকে, কারণ এই দুর্ঘটনায় আমরা এমন দুইজনকে হারিয়েছি যাদের ক্ষতি কখনোই পূরণ হওয়ার নয়। তাদের মধ্যে তারেক মাসুদ। যিনি বাংলাদেশের স্বাধীন চলচ্চিত্র পরিচালক, প্রযোজক, চিত্রনাট্যকার, লেখক এবং গীতিকার। তিনি ‘আদম সুরত’, ‘মাটির ময়না’, ‘মুক্তির গান’, ‘রানওয়ে’, ‘অন্তর্যাত্রা’র মতো বিখ্যাত সব চলচ্চিত্র আমাদের উপহার দিয়েছেন। এরমধ্যে ‘মাটির ময়না’ ও ‘মুক্তির গান’ সবচেয়ে বহুল আলোচিত চলচ্চিত্র। ‘মুক্তির গান’ মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক প্রামাণ্যচিত্র। আর ‘মাটির ময়না’ বাংলাদেশ থেকে অস্কারের বিদেশি ভাষার চলচ্চিত্র শাখায় যাওয়া প্রথম বাংলাদেশি বাংলা ভাষার চলচ্চিত্র। এছাড়া তারেক মাসুদ তাঁর পরিচালিত চলচ্চিত্রগুলো দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ঘুরে ঘুরে প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করতেন। দেশের বাইরের চলচ্চিত্রের সকল কলাকুশলীরা তারেক মাসুদকে একনামে চিনতেন এবং জানতেন। এইরকম একজন বড়মাপের চলচ্চিত্র পরিচালককে আমরা হারিয়েছে সড়ক দুর্ঘটনায়।

সড়ক দুর্ঘটনার আমরা আরও হারিয়েছি মিশুক মুনীরকে। বেপরোয়া বাস আমাদের মাঝ থেকে কেড়ে দেন আমাদের প্রিয় শিক্ষক, বন্ধু, অগ্রজ মিশুক মুনীরকে। মিশুক মুনীর বাংলাদেশের একজন প্রখ্যাত সাংবাদিক। তিনি শহীদ বুদ্ধিজীবী মুনীর চৌধুরীর মেজ ছেলে। তিনি একাধারে ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, সাংবাদিক ও চিত্রগ্রাহক।

মিশুক মুনীরকে বাংলাদেশের টেলিভিশন সাংবাদিকতার পথিকৃৎ বলা হয়। তিনি তারেক মাসুদের ‘রানওয়ে’ চলচ্চিত্রের প্রধান চিত্রগ্রাহক হিসেবে কাজ করেন। এছাড়া তিনি ‘রিটার্ন টু কান্দাহার’, ‘ওয়ার্ডস অব ফ্রিডম’ প্রামাণ্যচিত্রগুলোতেও কাজ করেছেন। মিশুক মুনীর এমন একজন মানুষ ছিলেন, যিনি সানন্দে সবাইকে কাজ শেখাতেন এবং কাজের ব্যাপারে উৎসাহিত করতেন। তিনি এতোটাই সাধারণ জীবনযাপন করতেন যে, তার এই সাধারণ জীবনযাপনের মধ্যে তার অসাধারণত্ব ফুটে উঠতো।
এইরকম দুইজন মহান ব্যক্তিকে আমরা সড়ক দুর্ঘটনায় হারিয়েছি। তারেক মাসুদ ও মিশুক মুনীরের মতো মেধাবীরা সবসময় পৃথিবীতে আসেন না। অনেকজনের মধ্যে একজন মেধাবী আসেন, জগৎ আলোকিত করেন, আলো ছড়ান সমাজে। সেই মেধাবীদের যখন সড়ক দুর্ঘটনা কেড়ে নেয় তখন আফসোসের অন্ত থাকে না।

সড়ক দুর্ঘটনা আমাদের বহু মেধাবী মুখ কেড়ে নিয়েছে। প্রতিবছর সড়ক দুর্ঘটনায় মেধাবী ও কর্মক্ষম জনসম্পদ হারিয়ে আমাদের দেশের অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্যমতে, গত বছর সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনা এবং এর প্রভাবে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতির আর্থিক পরিমাণ বছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার মতো। এসব দুর্ঘটনার কারণে বছরে মোট জাতীয় উৎপাদনের (জিডিপি) ২ থেকে ৩ শতাংশ হারাচ্ছে বাংলাদেশ। দুর্ঘটনায় জানমালের ক্ষতি ও দুর্ঘটনা থেকে সৃষ্ট যানজট আমাদের স্বাভাবিক অর্থনীতিকে স্থবির করে দিচ্ছে। আর সড়ক দুর্ঘটনায় মেধাবী ও কর্মক্ষম জনসম্পদের ক্ষতির পরিমাণ মোট জিডিপির দেড় থেকে ২ শতাংশ।

২.
সড়ক দুর্ঘটনার মেধাবী মুখ হারানো নতুন নয়। ১৯৮৯ সালের ২০ জানুয়ারি আমরা হারায় বাংলা চলচ্চিত্রের প্রভাবশালী চলচ্চিত্র পরিচালক আলমগীর কবিরকে। আলমগীর কবির মূলত একটি চলচ্চিত্র আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটিয়ে দিয়ে গিয়েছিলেন। যার ধারা পরে অব্যাহত রেখেছেন তার ছাত্ররা। তার দেখানো পথে তানভীর মোকাম্মেল, তারেক মাসুদ, মোরশেদুল ইসলামরা হেঁটেছেন। এরা সবাই আলমগীর কবিরের গড়া ‘ঢাকা ফিল্ম ইন্সটিটিউট’ ও ‘বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ’- এর ‘ফিল্ম অ্যাপ্রিসিয়েশন’ কোর্সের ছাত্র ছিলেন।

‘ধীরে বহে মেঘনা’, ‘সূর্য কন্যা’, ‘সীমানা পেরিয়ে’, ‘রূপালী সৈকতে’, ‘মোহনা’, ‘পরিণীতা’, ‘মহানায়ক’ এর মতো বিখ্যাত সব চলচ্চিত্রের পরিচালক আলমগীর কবির। এরমধ্যে ‘ধীরে বহে মেঘনা’ চলচ্চিত্রটির নির্মাণশৈলী বাংলাদেশে নির্মিত যেকোনো মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক চলচ্চিত্র থেকে আলাদা। আর ‘সীমানা পেরিয়ে’ চলচ্চিত্রটি ১৯৭০-এর ভয়াবহ জলোচ্ছ্বাসের একটি সত্য ঘটনাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠে। এই চলচ্চিত্রের স্বীকৃতি স্বরূপ তিনি শ্রেষ্ঠ সংলাপ ও চিত্রনাট্য রচয়িতা হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন।

এছাড়াও তাঁর তিনটি চলচ্চিত্র ব্রিটিশ ফিল্ম ইন্সটিটিউটের “বাংলাদেশের সেরা ১০ চলচ্চিত্র” তালিকায় স্থান পেয়েছে। এইরকম একজন মহান চলচ্চিত্র পরিচালক মারা যান সড়ক দুর্ঘটনায়। ১৯৮৯ সালে বগুড়ায় একটি চলচ্চিত্রবিষয়ক অনুষ্ঠান শেষে ঢাকা ফেরার পথে নগরবাড়ী ফেরিঘাটে একটি ট্রাকের ধাক্কায় গাড়িসহ নদীতে পড়ে মারা যান চলচ্চিত্র আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তি আলমগীর কবির।

আলমগীর কবির, তারেক মাসুদ, মিশুক মুনীর এইরকম মহান গুণীদের হারিয়ে আমরা একদিকে যেমন ভয়ানক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি অন্যদিকে একটি শিল্পের অধ্বঃপতন ডেকে এনেছি। এঁরা জীবিত থাকলে আমরা আরো ভালো কিছু চলচ্চিত্র পেতাম। যে চলচ্চিত্রগুলো বাংলাদেশকে বিশ্বের দরবারে আলাদা রূপে পরিচয় করিয়ে দিতো।

৩.
গত বছর আমরা সরকারি তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থী রাজীব হোসেন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী শাহরিয়ার সৌরভ, শহীদ রমিজউদ্দীন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের শিক্ষার্থী আবদুল করিম রাজীব ও দিয়া খানম মিমকে হারায়। পরিবারের মারফতে জানতে পারি, এরা সবাই মেধাবী ও পরিশ্রমী ছিলেন। জীবিত থাকলে এরা নিশ্চয় বাংলাদেশকে অন্য জায়গায় নিয়ে যেতেন নিজেদের মেধা ও কর্মদক্ষতায়। কিন্তু সেই সুযোগ তারা পাননি। তার আগেই তারা সড়কে নিজের প্রাণ বিসর্জন দিয়ে গেছেন।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সূত্রমতে, ১৯৯৮ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ঘটে যাওয়া সড়ক দুর্ঘটনা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ৫৩ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানোর কারণে। আর চালকদের বেপরোয়া মনোভাবের কারণে ৩৭ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। অর্থাৎ চালকের বেপরোয়া মনোভাব ও গতির কারণে ৯০ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটছে। আর পরিবেশ-পরিস্থিতিসহ অন্যান্য কারণে দুর্ঘটনা ১০ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটছে।

গবেষণা বলছে, সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহত ব্যক্তিদের বেশির ভাগই তরুণ ও কর্মক্ষম ব্যক্তি। এদের মধ্যে কেউ কেউ আবার মেধাবী।

দেশের সড়ক-মহাসড়কে দুর্ঘটনায় মারা যাওয়া জনগণের ৫৪ শতাংশের বয়স ১৬ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে। আর দুর্ঘটনায় নিহতদের সাড়ে ১৮ শতাংশ শিশু, এদের বয়স ১৫ বছরের নিচে।

স্বাধীনতার পর থেকে এখনো পর্যন্ত আমরা সড়ক ও যোগাযোগ খাতকে নিয়ন্ত্রণে আনতে পারিনি। এই ব্যর্থতা আমাদের সকলের। এরজন্য রাজনৈতিক কারণ যেমন দায়ী তেমনি দায়ী আমাদের ব্যক্তি পর্যায়ের উদাসীনতা। প্রশাসনের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আমরা আমাদের মেধাবী মুখগুলোকে হারাচ্ছি একে একে। যদি আমাদের ক্ষুদ্র পদক্ষেপ থেকে শুরু করে প্রশাসনিক তৎপরতা সড়ক দুর্ঘটনাকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে তবে আমরা আরো অনেক মেধাবী মুখ হারাবো। এই বিষয় নিয়ে আরো গুরুত্ব সহকারে ভাববার সময় এখনই। কোনোরকম অবহেলায় যেন আর কোনো মেধাবী মুখ না হারায় এই নিশ্চয়তা আমাদের নিজেদেরই দিতে হবে।

বিনয় দত্ত
কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক

Facebook Comments