ভাল থাকার ও ভাল রাখার গল্প!

Check for details

রাত পোহালেই মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব পবিত্র ঈদ উল ফিতর কিন্তু ঈদের সেই আমেজ তেমনটা নেই এখানে। ‘প্রবাস জীবন’ এই কথাটার মধ্যে ইদানীং কারাগারের একটি গন্ধ খুজে পাই! মনে হচ্ছে ছাদ বিহীন এক জেলখানায় বসবাস করছি। পরিবার পরিজন, আত্মীয় স্বজন ও কাছের বন্ধু বান্ধব ছাড়া সম্পুর্ন অজানা এক দুনিয়া। প্রতিনিয়ত হাজারো সাদা কালো মানুষের ভীড়ে অতি পরিচিত কিছু মুখ খুজে বেড়ানো!

কিন্তু না, আসলে আমরা হাজার হাজার মাইল দূরে কোন এক অজানা শহরে বসবাস করছি যেখানে আমাদের মনের মধ্যে ভেসে বেড়ানো মানুষগুলোকে পাওয়া অসম্ভব। এ যেন জীবনের অপরিহার্য বিয়োগান্ত কালো অধ্যায়ের অংশ।

কতগুলো প্রিয় মুখের হাসির জন্য প্রতিনিয়ত ভাল থাকার অনবদ্য অভিনয় করে যাচ্ছি আমরা প্রবাসীরা। এক প্রবাসী বড় ভাই আমাদের সহ যোদ্ধা তার সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখেছেন ” ঈদে প্রবাসীদের ৯০ ভাগের বেশী মানুষ নতুন জামাকাপড় পড়বে না! তারপরও তাদের ঈদ হবে এবং তারা খুসি থাকবে “।

খবরে জানা গেছে অতিতের সব রেকর্ড ভেঙে চুরমার করে এবারের ঈদ উপলক্ষে, এক মাসে সবচেয়ে বেশী রেমিট্যান্স পাঠিয়েছে প্রবাসীরা। বিষয়টি পরিবার, দেশ ও জাতির জন্য আনন্দের বটে কিন্তু একজন প্রবাসী জানে এর মাঝে কত বেদনা লুকিয়ে রয়েছে। নিজেদের সর্বোচ্চ বিলিয়ে নিজের বলতে অবশিষ্ট কিছু রাখে না।

এত কিছুর পরেও আমাদের প্রতি নিয়ত ভাল থাকতে হয় এবং ভাল রাখতে হয়! কিছুদিন আগে এক বন্ধু অনলাইনে কল দিয়ে বলছিলো…
= বন্ধু – হ্যাঁলো দোস্ত কি অবস্থা তোমার?
= আমি – হ্যাঁ দোস্ত ভাল আছি।
= বন্ধু – একেবারে ফোন টোন দেস না যে?
= আমি – কেন…. রে, তুই দিতে পারস না আমাকে? এখন তো আর ফোন দিতে টাকা লাগে না, যখন তখন ফোন দিতে পারিস। শুধু আমাকেই কেন ফোন দিতে হবে সবসময়? তোরও দায়িত্ব আছে আমার খোজ খরব রাখার!
= বন্ধু – আসলেই তো তাই! এমন করে কোনদিন ভেবে দেখিনি। এখন সময়-সুযোগ পেলে আমিও তোকে কল দিব, খোঁজ খবর নিব।
= আমি – ভাল থাকিস, পরে কথা হবে।

এমনটি শুধুমাত্র বন্ধুর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য তা নয় কিন্তু প্রায়শ সময় এমন বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয় আমাদের। এমনকি ভাই বোন বা নিকট আত্মীয়ের কাছ থেকেও এমন অভিযোগ শোনা যায়। প্রবাসে আসলেই যেন সব দ্বায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিতে হবে! পরিবারের ৫/৭ জন সদস্য এবং আত্মীয় স্বজন বন্ধু বান্ধবদের আর কোন দ্বায়িত্ব কর্তব্য নেই আমাদের প্রতি!

সাম্প্রতিক সময়ে প্রবাসের বিভিন্ন দেশে আত্মহত্যার সংখ্যা উদ্বেগজনক মাত্রায় বেড়ে চলেছে। এর অন্যতম কারণ হলো মানষিক চাপ যা দেশ তথা পরিবার এবং নিকট আত্মীয়দের কাছ থেকে আসে। দেশের অতিরিক্ত মানষিক এবং আর্থিক চাপের ফলে প্রবাসীরা ঝুঁকি পূর্ণ কাজের দিকে ঝুঁকছে বেশী আয়ের আশায়। এতে দুর্ঘটনার শিকার হয়েও অনেক প্রবাসী শ্রমিকের মৃত্যু হচ্ছে।

প্রবাসীরা তিল তিল করে, খেয়ে না খেয়ে, মাথার ঘাম পায়ে পেলে, রক্ত পানি করে এক একটি টাকা সঞ্চয় করে। মাস শেষে তা পরিবারের মঙ্গলের জন্য রেমিট্যান্স আকারে পাঠাচ্ছে দেশে। এতে করে দেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ার সাথে সাথে ফিরছে পরিবার গুলোতে আর্থিক স্বচ্ছলতা। গ্রামীণ জনপদের মানুষের আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধির বড় অবদান প্রবাসী আয়।

কিন্তু সেই প্রবাসীদের ঈদ কেমন কাটে? কি করে ঈদের দিনে? অথবা কি পরিধান করে বা খায় কি এমনটি কি কখনে ভেবে দেখেছেন? আমার সল্প প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা বলে, বেশীর ভাগ মানুষ ই ঈদের দিনে কাজ করতে হয় সিডিউল মাফিক। হোক ইউরোপ, আমেরিকা কিংবা মধ্য প্রাচ্য, প্রবাসী শ্রমিকদের আর্তনাদ সব জায়গায় একে রকম।

লেখকের ছবি

আমরা এত দুঃখ বেদনা আড়াল করে ভাল থাকতে শিখে গেছি আমাদের পরিবারকে ভাল রাখার প্রচেষ্টায়। তারপরেও অনেক প্রবাসীকে নানান অপবাদ মাথায় নিয়ে জীবন সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হয়। আমরা কখনো কিছু পাওয়ার আশায় এমন ত্যাগ তিতিক্ষা শিকার করছি না। কেবল মাত্র পরিবার ও স্বদেশের ভালবাসায় আমরা অবিরাম ভাল থাকছি এবং ভাল রাখছি। সবাইকে ঈদ উল ফিতর এর শুভেচ্ছা সকল রেমিট্যান্স যোদ্ধার পক্ষ থেকে।

মোঃ রাসেল আহম্মেদ
পর্তুগাল প্রবাসী গণমাধ্যম কর্মী

Facebook Comments