প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি সফর : সমাধান হোক ‘ফারাক্কা-তিস্তা’ সংকট

Check for details

জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগদান শেষে নিউ ইয়র্ক থেকে দেশে ফেরার দু’দিন পরই আজ ৩ অক্টোবর, বৃহস্পতিবার ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর আমন্ত্রণে আবার চার দিনের সরকারি সফরে নয়া দিল্লি সফরে গেলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই সফরে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম (ডব্লিউইএফ) আয়োজিত ইন্ডিয়ান ইকোনোমিক সামিটে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হবে শেখ হাসিনার। তবে প্রধানমন্ত্রীর এ সফরে যেন ফারাক্কা-তিস্তা সংকট বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় এ প্রত্যাশা বাংলাদেশের।

কারণ- একটু পেছনে গেলে দেখা যায়, ভারতের কলকাতা বন্দরকে পলি জমা থেকে রক্ষা করার জন্য পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মালদহ ও মুর্শিদাবাদ জেলায় গঙ্গা নদীর উপর ১৯৬১ সালে ফারাক্কা বাঁধের নির্মাণ কাজ শুরু হয়’ তা শেষ হয় ১৯৭৫ সালে। বিশেষজ্ঞদের অভিমত উপেক্ষা করে তৎকালীন ভারত সরকার এই মরণ বাঁধ নির্মাণ করে। পরবর্তীতে বিশেষজ্ঞদের অভিমতই সত্যি প্রমাণিত হয়। বর্তমানে বাংলাদেশসহ ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, বিহার রাজ্যে ব্যাপক পরিবেশ বিপর্যয় ডেকে এনেছে ‘ফারাক্কা বাঁধটি’।

বিশেষ করে ফারাক্কা বাঁধ বাংলাদেশের জন্য এক দুঃখের নাম। দেশের পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের জীবনে দুর্বিষহ এক অভিজ্ঞতার নাম ফারাক্কা বাঁধ। নির্মাণের পর থেকেই কাঁদিয়ে যাচ্ছে ফারাক্কা। আচমকা বাঁধের পানি তলিয়ে দেয় পশ্চিমাঞ্চল। বন্যায় ভেসে যায় ঘরবাড়ি। ওপারে গঙ্গা, এ পারে পদ্মা। যখন পানির জন্য পদ্মার এপারের মানুষ হাহাকার করে, তখন বাঁধের লকগেটগুলো বন্ধ থাকে। কিন্তু যখন বিহারে বন্যা হয় তখন খুলে যায় বাঁধের তালা। মুহূর্তে তলিয়ে যায় পশ্চিমের জনপদ। গত ৩০ সেপ্টেম্বর, সোমবার এমন ঘটনাই ঘটেছে।

১৯৬১ সালে নির্মাণকাজ শুরু করা ফারাক্কা বাঁধের কাজ শেষ হয় ১৯৭৫ সালে। ভোগান্তির শুরু হয় তখন থেকেই। বাঁধ নির্মাণের প্রায় ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশের সঙ্গে ফারাক্কার পানি বণ্টন চুক্তি করে ভারত। কিন্তু সেই চুক্তিও মানছে না প্রতিবেশীরা। এই বাঁধ যে দুই দেশের জন্যই দুর্ভোগের কারণ, এটি স্বীকার করেছেন ভারতের রাজনীতিক-বুদ্ধিজীবীরাও। দাবি উঠেছে, বাঁধ তুলে দেওয়ার। কিছুই হয়নি। বরং প্রতিবছরই একটা সময় বাঁধ ভেঙে ঢুকে পড়া পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে আমাদের পশ্চিমের জনপদ।

ভারতের সঙ্গে আমাদের বন্ধুত্ব বেশ নিবিড়। আমাদের সঙ্গে বাণিজ্যিক লেনদেনের সুসম্পর্কও আছে। পররাষ্ট্রনীতিতে ভারতের প্রতি বাংলাদেশের প্রতিবেশীসুলভ আচরণও বিশ্ববাসীর কাছে স্পষ্ট। আমরা চাই এই বন্ধুত্ব আরও সুদৃঢ় হোক। আরও নিবিড় হোক। ফারাক্কার যে দুঃখ আমাদের আচ্ছন্ন করে রাখছে, তা থেকে মুক্তি চাই। এ জন্য দুই দেশের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে ফলপ্রসূ আলোচনা প্রয়োজন। কারও ওপর চাপিয়ে দেওয়া নয়, যা করলে দুই দেশের মানুষই বন্যার হাত থেকে রক্ষা পাবে, এমন ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

যখন আমাদের পানি দরকার হয়, শুষ্ক মৌসুমে, তখন বন্ধ থাকে ফারাক্কা বাঁধ। তখন আমরা বলে-কয়েও কোনো প্রতিকার পাই না। কিন্তু যখন আমাদের পানির প্রয়োজন নেই, তখন নিজেদের রক্ষা করতে পানি নামিয়ে দেওয়া হয় বাংলাদেশে, এই আচরণ কোনোভাবেই কাঙ্ক্ষিত নয়।

আজ ৩ অক্টোবর, বৃহস্পতিবার, দিল্লি সফরে গেলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। নিশ্চয়ই আঞ্চলিক নানা বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হবে। এর মধ্যে অবশ্যই যেন সেখানে ফারাক্কা বাঁধের বিষয়টিও স্থান পায়। পাশাপাশি তিস্তা ব্যারেজ, সীমান্তে শান্তিপূর্ণ অবস্থা বজায় রাখার বিষয়েও আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। এছাড়া আসামের এনআরসির বাইরে থাকাদের নিয়ে দেশেটির বিভিন্ন পর্যায়ে নেতা ও ক্ষমতাসীনরা যেসব কথা বলছেন, তা বন্ধ করার ব্যাপারেও কথা হওয়া প্রয়োজন। অহেতুক কেউ যেন বাংলাদেশের ওপর চাপ সৃষ্টির চেষ্টা না করে, সেদিকেও সজাগ থাকার জন্য ভারত সরকারকে অনুরোধ করা প্রয়োজন। আমরা বিশ্বাস করি, প্রকৃত বন্ধুত্বের মানসিকতায়ই পারে দুই দেশের মধ্যেকার অমীমাংসিত বিষয়গুলোর সুন্দর সমাধান। পরিশেষে বলছি- সফল হোক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফর। সমাধান হোক ‘ফারাক্কা-তিস্তা’ সংকট।

ফাতেমা রহমান রুমা
সম্পাদক ও প্রকাশক
জার্মানবাংলা২৪ ডটকম

Facebook Comments