ধর্মান্ধতা, সাম্প্রদায়িকতা ও বাঙালিয়ানা

Check for details

বিনয় দত্ত

১.
ধর্মান্ধতা, সাম্প্রদায়িকতা ও বাঙালিয়ানা এই তিনটি যদি আলাদা বিষয় ধরি তাহলে এর মধ্যে কে এগিয়ে? এই প্রশ্ন করলে প্রথমেই আসবে ধর্মান্ধতা। এই ধর্মান্ধতা এখন সবার মননে, রন্ধ্রে রন্ধ্রে। রাষ্ট্র থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ সবাই ধর্মান্ধকে পুঁজি করে এগিয়ে যাচ্ছে। আমাদের জাতীয় চেতনাবোধ, মানবিক মূল্যবোধ হারিয়ে আমরা এখন ধর্মান্ধ পুতুলে পরিণত হয়ে যাচ্ছি দিন দিন। অথচ আমরা কিন্তু এইরকম ছিলাম না। অতীতে আমাদের সংস্কৃতি-ঐতিহ্যের মেলবন্ধন ছিল চমৎকার। সেই চমৎকারীর অহংবোধ এখন পর্যুদস্ত।
এইবার একটু পিছনে ফিরে যায়। ২১ মার্চ ১৯৪৮। স্থান রেসকোর্স ময়দান। মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ’র পূর্ব পাকিস্তান সফর উপলক্ষে আয়োজিত একটি বিশাল সমাবেশে জিন্নাহ স্পষ্ট ঘোষণা করেন যে ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্র ভাষা’। সমাবেশস্থলে উপস্থিত ছাত্র নেতৃবৃন্দ ও জনতার একাংশ সাথে সাথে তার প্রতিবাদ করে ওঠে। জিন্নাহ সেই প্রতিবাদকে আমলে না নিয়ে তার বক্তব্য অব্যাহত রাখেন।

পাকিস্তান এবং মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ’র কড়াল গ্রাস থেকে বেরিয়ে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নতুন এক রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখলেন। সেই রাষ্ট্রটি কেমন হবে? তা কি পাকিস্তানের আদলে হবে? এই রাষ্ট্রের মানুষ কি পাকিস্তানের মতো আচার আচরণ করবে? অন্যধর্মাবলম্বী জনগণ কি পাকিস্তানের মতো শোষিত ও নিপীড়িত হবে? এইসব প্রশ্ন তখন সহজেই চলে আসে। বঙ্গবন্ধু তখন চারটি মূলনীতির উপর ভিত্তি করে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেলেন। এই চার মূলনীতি দেখলেই সবারই স্পষ্ট ধারণা হয়ে যাবে, তিনি আসলে কেমন বাংলাদেশ চেয়েছিলেন।

চার মূলনীতির মধ্যে ছিল গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং জাতীয়তাবাদ। লক্ষ্য করলেই দেখা যায়, ধর্মনিরপেক্ষতাকে তৃতীয় স্থানে রাখা হয়েছে। কেন? কারণ হচ্ছে, গণতন্ত্র এবং সমাজতন্ত্রের পরে যে বিষয়টি সামনে আসে তা হচ্ছে ধর্মের নিরপেক্ষতা। অর্থাৎ নতুন যে জাতি নিয়ে বঙ্গবন্ধু সোনার বাংলা গড়বেন সেই জাতি সকল বর্ণ নির্বিশেষে ধর্ম নিরপেক্ষ হবে এবং রাষ্ট্র কোনোভাবেই পাকিস্তানের মতো আচরণ করবে না। প্রতিটি ধর্মের মানুষজন তাদের ধর্ম সুন্দর সুশৃঙ্খলভাবে পালন করতে পারবে। আরো সহজভাবে বলতে গেলে, মানুষ নিজেদের প্রয়োজনে ধর্মের পথে চলবে। ধর্ম পালন করতে আইনের মতো বাধ্য করা হবে না।
এই দেশের মানুষ আদতে ছিল ধর্মনিরপেক্ষ। তার প্রমাণ মেলে গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের লেখা ও শ্যামল গুপ্তের সুর করা গানটি দেখলেই। তিনি প্রথম অন্তরায় লিখেছেন,

‘বাংলার হিন্দু, বাংলার বৌদ্ধ,
বাংলার খ্রীষ্টান, বাংলার মুসলমান,
আমরা সবাই বাঙালি।।’

সবচেয়ে মজার বিষয় হল, যে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমরা বাঙালি, বাংলাদেশি এই সত্ত্বাটা অর্জন করেছি, সেই মুক্তিযুদ্ধের জনপ্রিয় শ্লোগানের মধ্যেও গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের লেখা গানটির প্রথম অন্তরা শ্লোগান হিসেবে বেশ জনপ্রিয় ছিল। যুদ্ধের সময় প্ল্যাকাডে প্ল্যাকাডে ‘বাংলার হিন্দু, বাংলার বৌদ্ধ, বাংলার খ্রীষ্টান, বাংলার মুসলমান, আমরা সবাই বাঙালি।।’ এই লাইনগুলো ঘুরতো।

গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার কল্পনা থেকে এইসব লাইন লিখেননি। তারা এদেশের মানুষের চলন, বলন, সংস্কৃতি, আদাবকেতা দেখেই এইসব লাইন লিখেছেন। এখন প্রশ্ন হল, আমাদের উত্তরসূরিদের সেই ধর্মনিরপেক্ষতার জায়গা থেকে আমরা কতদূর এগিয়েছি বা পিছিয়েছি?

২.
ধর্মন্ধতা এবং সাম্প্রদায়িকতায় আমরা যে কতটা এগিয়েছে তার নমুনা দেই। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, এই দেশে ১৯৬১ সালে সংখ্যালঘু জনসংখ্যার হার ছিল ১৯.৬ শতাংশ। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে ১৯৭৪ সালে এই সংখ্যা দাঁড়ায় ১৪.৬ শতাংশে। সর্বশেষ ২০১১ সালের জরিপ অনুযায়ী সংখ্যালঘু জনসংখ্যার হার কমতে কমতে দাঁড়ায় ৯.৬ শতাংশে।

এর অর্থ কি? এর অর্থ, এইদেশে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীদের সংখ্যা দিন দিন কমছে। কেন কমছে? তার কারণ রাষ্ট্র বা সমাজ তাদের নিরাপত্তা দিতে পারছে না, তাদের ধর্ম পালনে তারা স্বাধীন নয় অথবা তাদের অধিকার হরণ করা হচ্ছে। যেহেতু তারা নিরাপত্তাহীনতার ভুগছে তাই কোনো না কোনো দেশে তারা দেশান্তরী হচ্ছে বা বিলুপ্ত হচ্ছে। তাহলে কি ধর্মনিরপেক্ষতা থাকল? তবে কি সকল ধর্মের মানুষের সম অধিকারের জায়গাটা হারিয়ে গেল না?

অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবুল বারকাত ‘মুক্তবুদ্ধি’ প্রকাশনা থেকে ‘বাংলাদেশে কৃষি-ভূমি-জলা সংস্কারের রাজনৈতিক অর্থনীতি’ শিরোনামে ২০১৪ সালে একটি বই প্রকাশ করেন। তাতে তিনি বলেছেন, ১৯৬৪ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত এই ৫ দশকে মোট ১ কোটি ১৩ লাখ হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষ দেশত্যাগে বাধ্য হয়েছেন। অর্থাৎ প্রতি বছর গড়ে ২ লাখ ৩০ হাজার ৬১২ জন হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষ নিরুদ্দিষ্ট বা দেশত্যাগে বাধ্য হয়েছেন। আর প্রতিদিন দেশ ছেড়েছেন গড়ে ৬৩২ জন হিন্দু। এই হচ্ছে আমাদের ধর্মন্ধতা এবং সাম্প্রদায়িকতার নমুনা।

আমার প্রশ্ন হল, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর চারটি মূলনীতির উপর ভিত্তি করে সোনার বাংলা গড়েছি, তাতে ধর্মনিরপেক্ষতা তৃতীয় স্থানে, তা কি আমরা রক্ষা করতে পেরেছি? ধর্মনিরপেক্ষতার জায়গায় আমরা যদি কঠোর হতে পারতাম তবে আমাদের দেশ থেকে এইভাবে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীরা দেশ ত্যাগ করতে পারতো না। নিজভূমি ছেড়ে দেশাত্মরী হওয়া যে কতটা কষ্টের, কতটা যন্ত্রণার তা কাউকে বলে বোঝানো যাবে না।
বিভিন্ন অজুহাতে, বিভিন্ন কায়দায়, বিভিন্ন নিছক ঘটনায়, লোভ-লালসাকে পুঁজি করে একশ্রেণির ধর্মান্ধ লোকজন অন্যধর্মাবলম্বী মানুষের উপর যেভাবে চড়াও হয়েছে তার কোনো বিচার আজ পর্যন্ত হয়নি।
এতো এতো ঘটনার পর কেউ কি জোর গলায় বলবে আমাদের দেশ অসাম্প্রদায়িক দেশ? এই দেশে আদৌ কি ধর্মনিরপেক্ষতা আছে? রাষ্ট্র থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ সবাই অসাম্প্রদায়িক? এইকথা কেউই বলতে পারবে না। এইটা সবচেয়ে বড় দুঃখের জায়গা।

৩.
ধর্মান্ধতা এবং সাম্প্রদায়িকতার এপিঠ, ওপিঠ আমাদের চেনা জানা। নতুন যে বিষয়টি অপরিচত ঠেকছে তা হল পরিচয়। এখন কারো পরিচয় জানতে চাইলে তিনি কোন ধর্মের মানুষ তা সবার আগে উঠে আসে। এইটা বেশ অদ্ভুত এবং শঙ্কার। প্রথমে একজন মানুষকে মানবিক গুণসম্পন্ন হতে হবে এরপর তার জাতীয় পরিচয় এবং সর্বশেষ তার ধর্মীয় পরিচয়ে পরিচিত হওয়া উচিত। কিন্তু তা হচ্ছে না। এর সাথে যুক্ত হয়েছে আবার ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন।

সম্প্রতি ডিজিটাল আইনে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতহানার বিষয়টি বেশ গুরুত্ব পেয়েছে। ধর্মীয় অনুভূতি তৈরি হওয়ার আগে তো ধর্মের নিরপেক্ষতার জায়গাটা জোর দেয়া উচিত, যেটা আমাদের দেশে একদমই নেই। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতহানার বিষয়টি যদি জোর দেয়া হয় তাহলে তো সবার আগে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ এই মামলায় পড়ে যাবে। কারণ তাদের যে ১৩ দফা দাবী তা তো অন্যধর্মের জনগোষ্ঠীর মনে আঘাত দেয়ার মতো। যদিও তারা এখন বর্তমান সরকারের সবচেয়ে আশীর্বাদপুষ্ট দল।

হেফাজতের সভাপতি আহমদ শফী তার এক বক্তব্যে নারীদের পঞ্চমশ্রেণির বেশি পড়াতে নিষেধ করেছেন। নারীদের তেঁতুলের সাথে তুলনাও করেছেন। আবার এই হেফাজতে ইসলামের দাবীতে আমাদের পাঠ্যপুস্তক পরিবর্তিত হয়ে যায়। প্রগতিশীল এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লেখকদের লেখা পাঠ্যপুস্তক থেকে বাদ দেয়া হয়।
আরও মজার ব্যাপার হল, মঙ্গল শোভাযাত্রা আমাদের সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যের প্রতীক। ইউনেস্কো বিশ্ব সংস্কৃতির অংশ হিসেবে মঙ্গল শোভাযাত্রাকে স্বীকৃতি দিয়েছে। এই মঙ্গল শোভাযাত্রা নিয়েও আহমদ শফী ও হেফাজতে ইসলামের আপত্তির শেষ নেই। মঙ্গল শোভাযাত্রা আমাদের সংস্কৃতি নয় এইধরনের কিছু আপত্তিকর কথা সবসময়ই বলেন। যদি ডিজিটাল আইন প্রয়োগ করা হয় তবে কি হেফাজতের সভাপতি আহমদ শফী রক্ষা পাবেন?

দুঃখের বিষয়, এখন এইসব আহমদ শফীরাই গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। ধর্মান্ধ না হলে এখন আর রাষ্ট্রীয়ভাবে আপ্যায়িত হওয়া যায় না। এইসব কারণে সাধারণ জনমনেও এখন ধর্মান্ধরা প্রচণ্ডভাবে ভর করেছে। না হয়, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে গরুর মাংসে হাড় বেশি দেওয়ার অভিযোগে খাঁটিহাতা ও কুট্টাপাড়া গ্রামের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। সেই সংঘর্ষে পুলিশসহ ২০ জন আহত হয়েছেন।
কোথায় যাচ্ছি আমরা? এই কি আমাদের ধর্মনিরপেক্ষ দেশ? এই দেশ কি বঙ্গবন্ধু চেয়েছিলেন?

৪.
রাজনৈতিক দলগুলোর ধর্মান্ধ দলের সাথে বিশেষ সম্পর্ক গড়া, ধর্মান্ধ দলকে বিশেষ সুযোগ সুবিধা দেয়া, অসংখ্য সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী মানুষের উপর নির্যাতনের বিচার না হওয়া, ধর্মান্ধ দলের নির্দেশে পাঠ্যপুস্তক পরিবর্তিত হওয়া এইসব কিসের প্রতীক? এইসব কিছুই আমাদের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য থেকে দূরে সরে যাওয়ার প্রতীক।

যে মুক্তিসংগ্রামে অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বাংলাদেশ গড়ে তুলেছি সেই চেতনা থেকে আমরা এখন অনেক দূরে। এখন সাম্প্রদায়িকতা সবার চিন্তা চেতনায়, ধর্মান্ধতা সবার মননে। বঙ্গবন্ধু যে চেতনায় বাংলাদেশ গড়ে তুলেছিলেন সেই বাংলাদেশ এখন আর নেই। ধর্মান্ধতা আর সাম্প্রদায়িকতার ভিড়ে আমরা কখন যে নিজেদের বাঙালি সত্ত্বাকে বিসর্জন দিয়েছি তা আমরা নিজেরাও জানি না। এর থেকে উত্তরণ পাওয়া সম্ভব। হয়তো আমাদের রাষ্ট্র ব্যবস্থা তা চাইছে না, অথবা আমরা চাইছি না।

বিনয় দত্ত
কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক

Facebook Comments