দুর্নীতি নাকি জিডিপি, কে এগিয়ে?

Check for details

বিনয় দত্ত.

১.
দুর্নীতি নাকি জিডিপি (মোট দেশজ উৎপাদন) কে এগিয়ে? দুইজনের মধ্যে প্রতিযোগিতা আয়োজন করা হয়েছে। আয়োজক কমিটি থেকে শুরু করে সকল পৃষ্ঠপোষক এই প্রতিযোগিতা আয়োজন করতে পেরে বেশ বড় ধরনের সন্তুষ্টিতে ভুগছে। এই সন্তুষ্টি দেখানোর জন্য তারা কিছুক্ষণ পর পর নিজেদের প্রচারণাও চালিয়ে যাচ্ছে। প্রতিযোগিতা দেখার জন্য স্টেডিয়ামের প্রতিটি প্রান্তে অগণিত দর্শক। সবার কৌতূহল কে জিতবে এইটা দেখার অপেক্ষায়।
এই প্রতিযোগিতা দেখছে সবাই, দেখছে দেশের বাইরের জনগণও। দুই পক্ষের আলাদা আলাদা সমর্থক গলা ফাটিয়ে পুরো স্টেডিয়াম উত্তপ্ত করে ফেলছে। দুই পক্ষের সবাই জয়ী হওয়ার ব্যাপারে সর্বোচ্চ আশাবাদী। সমর্থকদের কেউ কেউ আবার অধিক উত্তেজনায় বাজি ধরে ফেলেছে।
এইসব চাপা এবং দৃশ্যত উত্তেজনা থাকতে থাকতেই প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়। দুই প্রতিযোগি নিজেদের অবস্থান থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে জয়ী হবার। প্রতি মুহূর্তে দর্শক, সমর্থকদের উত্তেজনা উগড়ে উগড়ে পড়ছে। কে জিতবে? কে হারবে? এই শঙ্কা চলতে চলতে দুর্নীতি বেশ বড় ব্যবধানে জিডিপি (মোট দেশজ উৎপাদন)কে হারিয়ে দেয়। জিডিপির সমর্থক সহ সকল দর্শকরা হতাশ হয়ে পড়ে। স্টেডিয়ামে জিডিপি’র অধিক দর্শক, সমর্থক থাকলেও তারা প্রতিযোগিতায় হেরে চুপষে যায়।
এটি একটি কাল্পনিক প্রতিযোগিতা হলেও মূলত বাস্তবতা কিন্তু এইরকমই। দুর্নীতি আমাদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করেছে। দুর্নীতিবাজদের আধিপত্যে আমাদের গোটা ব্যবস্থাটা কলুষিত হয়ে পড়েছে। দুর্নীতি বিরোধী আন্তর্জাতিক সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের তথ্যানুযায়ী, ২০১৭ সালের তুলনায় ২০১৮ সালে দুর্নীতি বেড়েছে। ২০১৮ সালে সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ১৩তম, আর ২০১৭ সালে ছিল ১৭তম স্থানে। বিশ্বজুড়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় বাংলাদেশ এবার আরো খারাপ অবস্থানে গেছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রাথমিক প্রাক্কলন হলো ২০১৮-১৯ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির হার হতে যাচ্ছে ৮.১৩ শতাংশ। মানে, গত অর্থবছরের তুলনায় চলতি অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তথা অর্থনীতির আয়তন এই হারে বড় হয়েছে। আরো বিশদভাবে বললে, দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড যে দ্রুত হারে বেড়ে চলেছে, তা ৮ শতাংশের ওপরে প্রবৃদ্ধি তা–ই নির্দেশ করে। এটি বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সংখ্যক জিডিপি প্রবৃদ্ধি। জিডিপির সাথে সাথে আমাদের মাথাপিছু বার্ষিক আয় বেড়ে দাঁড়াবে এক হাজার ৯০৯ ডলারে।
বিষয়টা একটু পরিষ্কার করি। যে পরিমাণ অর্থনৈতিক উন্নতি আমাদের দেশে হচ্ছে তার বেশিরভাগই দুর্নীতির কালো বিড়াল লুণ্ঠন করছে। যে পরিমাণ মাথাপিছু আয় আমাদের দেশে হয়েছে বা হবে তার বেশির ভাগ অর্থ ছোট থেকে শুরু করে বড় দুর্নীতিবাজদের দখলে চলে যাচ্ছে।
২০১৮ সালের আগস্টে প্রকাশিত ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের খানা জরিপে ঘুষ–দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরা হয়। পরিসংখ্যানে বলা হয়, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ঘুষ লেনদেনের পরিমাণ ছিল ১০ হাজার ৬৮৮ কোটি ৯০ লাখ টাকা। ২০০৭ সালের ২৮ আগস্ট সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী পদ্মা সেতুর বাজেট ধরা হয়েছিল ১৬১ কোটি টাকা। সর্বশেষ পদ্মা সেতুর বাজেট দাঁড়ায় ২৮ হাজার ৭৯৩ কোটি টাকায়। অর্থাৎ পদ্মা সেতুর বর্তমানের ব্যয়ের এক শতাংশ একটি দেশে মোট অর্থবছরে ঘুষ লেনদেন হয়। আরো সহজভাবে বললে, পদ্মা সেতুর মোট বাজেটের এক ভাগ টাকা আমাদের দেশে ঘুষের জন্য ব্যয় হচ্ছে। এই ঘুষ যদি বন্ধ করা যেত তাহলে পদ্মা সেতুর মতো আরেকটি বড় প্রকল্প আমরা হাতে নিতে পারতাম নিশ্চয়।
টিআইবি’র ওই জরিপের তথ্য অনুযায়ী দেশের সর্বোচ্চ দুর্নীতিগ্রস্ত খাত হল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা। এরপরের অবস্থানে রয়েছে যথাক্রমে পাসপোর্ট, বিআরটিএ, বিচারিক সেবা ও ভূমি সেবা।
যে দেশে একটি অর্থ বছরে ১০ হাজার ৬৮৮ কোটি ৯০ লাখ টাকা ঘুষের লেনদেন হয় সেই দেশে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যদি ৮ পেরিয়ে ৯ এর সংখ্যায় যায় তাতেও কোনো লাভ হচ্ছে? হচ্ছে না। একদিকে প্রচুর অর্থের জোগান হচ্ছে অপরদিকে বিপুল অর্থে দুর্নীতিতে লুটপাট হচ্ছে।

২.
দুর্নীতি বিষয়ে একটা মজার তথ্য হল, অনেকেরই ধারণা শুধু অর্থ লেনদেন হলেই বুঝি দুর্নীতি হয়, বিষয়টা কিন্তু এইরকম নয়। যেকোনো কাজ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ না করে তা দীর্ঘায়িত করা, সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে সকল কর্মচারী থেকে শুরু করে কর্মকর্তা বা উর্ধ্বতন কর্মকর্তা পর্যন্ত সঠিক সেবা দেয়ার ব্যাপারে প্রতিশ্রুতি দিয়ে তা না দেয়া, কাউকে সঠিকভাবে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা না করা সহ সকল প্রতিশ্রুতিমূলক বা সেবামূলক কাজ সঠিক সময়ে না করলে দুর্নীতি হয়।
পত্রপত্রিকা খুললে প্রায় সময়ই জানা যায় সরকারি বড় বড় প্রকল্পগুলো নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ সম্পন্ন হচ্ছে না। এই যে প্রকল্পটা দীর্ঘায়িত হচ্ছে, এর পিছনে আবার নতুন অর্থ বরাদ্দ হচ্ছে, নতুন করে শ্রম বিনিয়োগ হচ্ছে, নতুন যন্ত্রপাতি সহ দক্ষ জনবলের যোগান হচ্ছে বা সেই প্রকল্পের সাথে অন্য প্রকল্পগুলো সংযুক্ত থাকলে তাও ব্যাহত হচ্ছে, সার্বিকভাবে এতে দেশের বিশালক্ষতি হচ্ছে। এই যে দেশের ক্ষতি করছে অল্পকিছু লোকজন। এইটা অবশ্যই দুর্নীতি, এইটা ভয়ানক অপরাধ।
সেবাদানকারী সকল প্রতিষ্ঠানে কর্মচারী থেকে শুরু করে কর্মকর্তা বা উর্ধ্বতন কর্মকর্তা সকলকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে সেবা দানের জন্য। তারা নিজেদের কাজ সঠিকভাবে করছে না, এতে করে সকলেই ভোগান্তির শিকার হচ্ছে। শুধু ভোগান্তি নয়, এর সাথে সকলের কর্মঘণ্টা, আর্থিক, শারিরীক, মানসিক ক্ষতি হচ্ছে। যে প্রতিজ্ঞা নিয়ে একজন ব্যক্তিকে সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ দেয়া হয়েছে সেই প্রতিষ্ঠানে সেই ব্যক্তি যখন তার কাজে ফাঁকি দিবেন তখন তা দুর্নীতির মধ্যে পড়ে, যা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
সাতক্ষীরার শ্যামনগর থানায় টাকা ছাড়া জিডি নেয়া হয়না। এইটা একটা নমুনা মাত্র। এইরকম আরো অনেক থানার খবর পাওয়া যাচ্ছে প্রতিমুহূর্তে। যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বেতন হয় জনগণের টাকায় সেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জনগণের প্রতি অনীহা কোনোভাবেই কাম্য নয়। যে প্রতীজ্ঞা নিয়ে একজন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ব্রতী হয়েছেন সেই প্রতীজ্ঞা রক্ষা করছেন না তিনি। এইটা অপরাধ, এইটা দুর্নীতি।
পাসপোর্ট, আইনশৃঙ্খলা, স্বাস্থ্য সেবা, বিআরটিএ, বিচারিক সেবা, শিক্ষা, ভূমি সেবা, সড়ক খাত, রেল খাত সহ আরো অনেক সরকারি প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতি চিত্র সুস্পষ্ট। যার প্রমাণ পাওয়া যায় গণমাধ্যমগুলোতে। প্রতিনিয়তই এইসব খাতের কোনো না কোনো জায়গায় দুর্নীতি খবর আছেই।
২০১৬-২০১৮ এই তিন বছরে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অভিযানে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের বড় অংশই সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী। এই তিন বছরে গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৬৪১ জনকে। তাদের মধ্যে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীই ৩৬১ জন। এর বাইরে ব্যাংক ও বীমা কর্মকর্তা ১৪১, ব্যবসায়ী ৭৫, জনপ্রতিনিধি ৩১ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন।
৩.
কত অপার সম্ভাবনা আমাদের এই দেশের। তলাবিহীন ঝুড়ি থেকে শক্তিশালী অর্থনৈতিক সামর্থ্যবান দেশে পরিণত হয়েছি আমরা। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০১৮ সালের রেমিট্যান্স আহরণে নতুন রেকর্ড তৈরি হয়েছে। গত বছর দেশে এক হাজার ৫৫৭ কোটি ডলারের সমপরিমাণ রেমিট্যান্স এসেছে। ২০১৭ সালে এসেছিল এক হাজার ৩৫৩ কোটি ৪৯ লাখ ডলারের রেমিট্যান্স।
বিশ্বখ্যাত মার্কিন সাময়িকী ফোর্বস প্রকাশিত এশিয়ায় ‘৩০ অনূর্ধ্ব ৩০ ২০১৯’ তালিকায় বাংলাদেশি দুইজনের নাম স্থান পেয়েছে। এই দুই তরুণ হলেন, কার্টুনিস্ট আবদুল্লাহ আল মোরশেদ ও রাইড শেয়ারিং প্রতিষ্ঠান পাঠাওয়ের সহপ্রতিষ্ঠাতা হুসাইন মোঃ ইলিয়াস। এইটা যে আমাদের দেশের জন্য কত বড় আনন্দের এবং গর্বের সংবাদ তা বলে বোঝানো যাবে না।
প্রতিবছর দেশে রেমিট্যান্সের পরিমাণ বাড়ছে, প্রতিদিন নতুন সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে, প্রতিমুহূর্তে আমাদের তরুণরা বহির্বিশ্বে নিজেদের কর্মদক্ষতায় দেশের সুনাম ছড়িয়ে দিচ্ছে সেই জায়গায় আমরা যদি দুর্নীতি মতো ক্ষুদ্র বিষয়ের কাছে হেরে যাচ্ছি, যা আমাদের জন্য চরম অপমানের।
যে পাকিস্তান আমাদের শোষণ করেছে, আমাদের সকল বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেছে যেন আমরা এগিয়ে যেতে না পারি, সেই পাকিস্তানের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির চেয়ে বেশি এগিয়েছি আমরা। আমাদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি বাইরের দেশের কাছে ঈর্ষার জায়গায় পৌঁছেছে। এতো এতো উন্নয়ন, সমৃদ্ধিকে পিছনে ফেলে দিচ্ছে দুর্নীতিতে আমাদের ১৩তম স্থান। যদি এই কলংক আমরা মোচন করতে না পারি তবে আমাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ৮.১৩ শতাংশ ফিকে হয়ে যাবে। তবে কি আমরা দেশকে সেইদিকে ঠেলে দিবো? উত্তর আমাদের নিজেদের কাছে।

 

বিনয়দত্ত

কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক

Facebook Comments