1. jashimsarkar@gmail.com : admin :
  2. fatama.ruma007@gmail.com : Fatama Rahman Ruma : Fatama Rahman Ruma
  3. anikbd@germanbangla24.com : Editor : Editor
  4. rafid@germanbangla24.com : rafid :
  5. SaminRahman@germanbangla24.com : Samin Rahman : Samin Rahman

গণপরিবহন কতটা জনবান্ধব?

জার্মানবাংলা২৪ রিপোর্ট :
  • প্রকাশের সময়: সোমবার, ৭ জানুয়ারী, ২০১৯
Check for details

বিনয় দত্ত
১.
রাস্তায় প্রচুর লোক দাঁড়িয়ে আছেন বাসায় যাওয়ার উদ্দেশে। মানুষের সাথে সাথে অনেক গাড়িও দাঁড়িয়ে আছে। তীব্র যানজটে নগরবাসীর অবস্থা বেহাল। এই দৃশ্যপট মোটামুটি প্রতিদিন বিকাল বেলার। মহাখালী-চেয়ারম্যানবাড়ি-বনানী-কাকলী সড়ক। বিশাল রাস্তায় জুড়ে অসংখ্য ব্যক্তিগত পরিবহন। বাকি যেসব গণপরিবহন দাঁড়িয়ে আছে তার প্রত্যেকটির দরজা বন্ধ। সামনে লেখা ‘সিটিং সার্ভিস’ দরজার পাশে লেখা ‘হাফ পাস নাই’। যাত্রীরা বাসে উঠার চেষ্টা করেও বিফল হচ্ছে কারণ সিটিং সার্ভিস নামক বাসগুলো দরজা বন্ধ করে রেখেছে। প্রায় প্রতিটি বাসের মধ্যে যাত্রীরা বসে আছেন আর কয়েকজন যাত্রী দাঁড়িয়েও আছেন। এই দুর্ভোগ একদিনের নয়, প্রতিদিনের, প্রতিসপ্তাহের, প্রতিমাসের।

পরের সপ্তাহ। রাত আটটা। মালিবাগ-মগবাজার-হাতিরঝিল-সাতরাস্তা-তিব্বত-নাবিস্কো-মহাখালী সড়ক। প্রতিটা স্টপেজে কমপক্ষে ২০-৩০ সাধারণ যাত্রী দাঁড়িয়ে আছেন বাসে উঠার জন্য। তাদের মধ্যে নারী, পুরুষ, শিশুরাও আছে। কিছুক্ষণ পর পর একটা করে বাস আসে। প্রতিটা বাসে একজন বা দুইজন যাত্রী একরকম ধাক্কাধাক্কি করে বাসে উঠছেন। বাসে উঠতে না পেরে বাকিরা সবাই হতাশ হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। কেউ আবার পায়ে হেঁটে যতটা সম্ভব এগিয়ে যাচ্ছেন। এই সময়টাতেও বাসে উঠতে না পাওয়ার ভোগান্তি একদিনের নয়, প্রতিদিনের।

গবেষণা বলছে, রাজধানীতে রাস্তার তুলনায় প্রায় ৩ লাখ যানবাহন বেশি চলছে। এছাড়া প্রতিদিন গড়ে ২৩০টি নতুন গাড়ি ঢাকার রাস্তায় নামছে। গবেষণার তথ্যানুযায়ী সাধারণ জনগণের গণপরিবহন বা বাস পেতে অসুবিধা হওয়ার কথা না কিন্তু এরপরও যাত্রীদের গণপরিবহন পেতে এতো দুর্ভোগ কেন?

২.
ঢাকার বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় পৌনে দুই কোটি। মেগাসিটির বিচারে ঢাকা বিশ্বের নবম জনবহুল শহর। শুধু জনসংখ্যার বিচারে যে ঢাকা বাংলাদেশের নগর ব্যবস্থায় প্রবল প্রাধান্য বিস্তার করে তা-ই নয়, বরং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সব ক্ষেত্রেই ঢাকার প্রাধান্য অনেক বেশি।

প্রায় পৌনে দুই কোটি জনসংখ্যার বাইরেও চিকিৎসা, শিক্ষা, আবাসন, কর্মসংস্থান সহ বিভিন্ন সুযোগসুবিধা পাওয়ার আশায় বিভিন্ন জেলা শহর থেকে রাজধানীতে প্রতিদিন মানুষ ছুটে আসেন। অপরিকল্পিত এই শহরে ছুটে এসে যাতায়াত করতে গিয়ে মানুষকে চরম বিপাকে পড়তে হয়। এই বিশাল জনসংখ্যা বাংলাদেশের জাতীয় আয়ের প্রায় ৪০ ভাগ অবদান রাখে।

বিশাল জনসংখ্যার মধ্যে উচ্চবিত্ত যেমন রয়েছেন তেমন নিন্মবিত্ত শ্রেণিপেশার লোকজনও রয়েছেন। প্রতিটি শ্রেণির জন্য আলাদা আলাদা যাতায়াত ব্যবস্থা থাকবে এইটাই স্বাভাবিক অর্থাৎ একজন ব্যক্তির অর্থনৈতিক সামর্থ্যের উপর তার যাতায়াত ব্যবস্থা ভিন্ন হবে। কারো বেশি সামর্থ্য থেকে তবে তিনি বেশি সুযোগ সুবিধা নিয়ে যাতায়াত করবেন আর কারো কম সামর্থ্য থাকলে তিনি কম সুযোগ সুবিধা নিয়ে যাতায়াত করবেন। এই অর্থনৈতিক সামর্থ্যের কথা বিবেচনা না করে যখন প্রশাসন সকলকে একটা নির্দিষ্ট অর্থনৈতিক শ্রেণিতে নিয়ে আসার চেষ্টা করবে তখনই সমস্যাটা প্রকট হবে, যেমন এখন হয়েছে।
সিটিং সার্ভিস বা সিটিং পরিবহনের নিয়ম অনুযায়ী, একটি নির্দিষ্ট রুটে বেশি দূরত্বের যাত্রীদের জন্য আলাদা সুযোগ সুবিধা দিয়ে সত্যিকার অর্থেই সিটিং সার্ভিস চালু করা যেতে পারে, যা যাত্রীদের সবার জন্য মঙ্গলকর হবে। যাত্রীদের উঠানামার জন্যে নির্দিষ্ট স্টপেজ পর পর কাউন্টার থাকবে। তাতে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন (বিআরটিএ) কর্তৃপক্ষের অনুমতিক্রমে ভাড়ার আলাদা তালিকা থাকবে এবং সেই সেবা যাত্রীরা পাচ্ছেন কিনা তা তদারকি করার জন্য প্রশাসনের মনিটরিং টিম থাকবে। এছাড়াও সেই নির্দিষ্ট রুটে যাতে অন্য যাত্রীরা চলাচল করতে পারেন সে কথা বিবেচনায় রেখে লোকাল বাস সার্ভিস চালু থাকবে, যাতে করে সল্প আয়ের যাত্রীরা নিয়মিত যাতায়াত করতে পারেন। কিন্তু রাজধানী ঢাকাতে চলছে ভিন্ন ব্যবস্থা।

৩.
পর্যালোচনার বিষয় হল, ঢাকা শহরের আয়তন অনুযায়ী সিটিং বাস সার্ভিস কতটা যৌক্তিক। অধিক জনসংখ্যর কারণে ঢাকার উত্তর এবং দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রায় প্রতিটা এলাকাতেই মানুষ বসবাস করেন। আব্দুল্লাহপুর, আজমপুর, রাজলক্ষী, জসিমউদ্দিন, এয়ারপোর্ট থেকে যেমন যাত্রীরা উঠানামা করেন, তেমনি সায়েদাবাদ, গোলাপবাগ, কমলাপুর, মতিঝিল, দৈনিকবাংলা, পল্টন এইসব স্টপেজ থেকেও যাত্রীরা উঠানামা করেন।

মূল বিষয়টি হল, ঢাকার আয়তন অনুযায়ী অল্প দূরত্ব পর পর একেকটি স্টপেজ পড়ছে। এই সকল স্টপেজেই যাত্রী আছেন এবং তারা নিয়মিত যাতায়াত করেন। যদি ঢাকার আয়তন সুবিশাল হত এবং জনসংখ্যার চাপ কম থাকতো তখন সিটিং বাস সার্ভিস চালু করা যুক্তিযুক্ত ছিল। যেহেতু এই শহরের আয়নের তুলনায় জনসংখ্যার চাপ অত্যধিক বেশি তাই সল্প দূরত্বের যাত্রীদের জন্য সিটিং বাস সার্ভিস চালু করার কোনো যৌক্তিকতা নেই। এখন ক্ষমতার বলে যদি কোনো মহল সিটিং বাস সার্ভিস চালু রাখে তাতে সাধারণ জনগণের আয়ের উপর বিশাল চাপ পড়ে।

রাজধানীতে বর্তমানে যেসব সিটিং সার্ভিস বাস চালু আছে তার বেশিরভাগই পুরানো বাসের নতুন সংস্করণ। সকল পুরানো বাসগুলো নতুন রং করে একরকম জোর করে ‘সিটিং সার্ভিস’ বানানো হয়েছে। পুরানো বাসগুলো রং করে ভাঙ্গা সিট নিয়েই চালানো হচ্ছে। কিছু নতুন বাস নামানো হয়েছে কিন্তু তার সংখ্যাও ক্ষীণ। আবার এই সিটিং সার্ভিসের কোনো সুনির্দিষ্ট কাউন্টার নেই। যাত্রী সংখ্যা কম থাকলে প্রতিটা স্টপেজেই বাস দাঁড়িয়ে যাত্রী তোলে। কখনো কখনো আবার সিটের বাইরে দাঁড়িয়েও যাত্রী তোলে। মোটকথা, শুধু বাড়তি টাকা আদায় করার জন্য যাত্রীদের প্রতারিত করে এই সিটিং সার্ভিস ক্ষমতার বলে টিকে আছে।
রাজধানী ঢাকাতে বর্তমানে যেসব সিটিং সার্ভিস চলছে তার বৈধতার বিষয়ে যথেস্ট প্রশ্ন রয়েছে। এইসব সিটিং সার্ভিস যদি বৈধ হতো তবে তাদের প্রতি প্রশাসনের সুদৃষ্টি থাকতো। যদি এই সার্ভিস বিআরটিএ’র সুষ্ঠু নিয়মে চলতো তবে কিছুদিন পর পর সকল গণমাধ্যমে তাদের অনিয়মের বিষয় তুলে ধরে রিপোর্ট ছাপানো হত না। যদি এইসব সিটিং সার্ভিসগুলো বৈধ হত তবে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী জনাব ওবায়দুল কাদের তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলতেন না। এতোসব কারণ থেকেই বোঝা যায় সিটিং বাস সার্ভিস বা সিটিং সার্ভিস কতটা বৈধ।

৪.
সিটিং সার্ভিসে মূলত কি ধরনের সমস্যা তৈরি হয়? একটি ৪০ সিটের লোকাল বাসে ৪০ জন যাত্রী বসার পর আরও ২০-২৫ জন যাত্রী দাঁড়িয়ে যেতে পারেন, তাহলে মোট যাত্রী সংখ্যা হচ্ছে ৬০-৬৫ জন। বাসটি প্রথম স্টপেজ থেকে চাহিদা অনুযায়ী মোটামুটি সংখ্যক যাত্রী নিয়ে রওনা দেয়। এরপর প্রতিটা স্টপেজ অতিক্রম করার পর কিছু যাত্রী নেমে যান আবার কিছু যাত্রী উঠেন। এইভাবে একটা পর্যায়ে বাসটি সর্বোচ্চ ৬০-৬৫ জন যাত্রী নিয়ে চলাচল করে। কখনো যাত্রীর চাপ বেশি থাকলে তা ৭০-৭৫ তে এসে পৌঁছায়।
এই ৬০-৬৫ জন যাত্রীর জায়গায় যখন ৪০ জন যাত্রীকে সর্বোচ্চ ধরে বাসটি যাতায়াত করে তখন বাকি যাত্রীদের জন্য আরেকটি বাসের প্রয়োজন পড়ে। এইভাবে প্রতিবার ৬০-৬৫ জন যাত্রীর জায়গায় যখন ৪০ জন যাত্রীকে নিয়ে বাসটি চলাচল করে তখন বাড়তি যাত্রীরা হয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকেন না হয় একরকম ধাক্কাধাক্কি করে বাসে উঠার চেষ্টা করেন। ফলে প্রায়শই তাদের ছোট বড় দুর্ঘটনার শিকার হতে হয় এবং মনুষ্য যানজট তৈরি হয়। তাতে করে রাস্তায় সুষ্ঠুভাবে গাড়ি চলাচলে বিঘ্ন ঘটে।
সবচেয়ে বেশি অসিবিধা হয় নারী যাত্রীদের। নারী যাত্রীরা পুরুষদের সাথে ধাক্কাধাক্কি করে বাসে উঠতে পারেন না। আর নারীদের জন্য নির্ধারিত সিট থাকলেও সেইসব সিটে পুরুষ যাত্রী বসিয়ে তারা দরজা বন্ধ করে যাতায়াত করে ফলে নারী যাত্রীদের দুর্ভোগ চরমে উঠে যায়। একজন কর্মজীবী নারী যদি বাসা থেকে বের হয়ে আবার বাসায় ফিরে যাওয়ার জন্য সঠিক গণপরিবহন না পান তবে তার চাকরি বা ব্যবসা করার উৎসাহ থাকে না এবং নারীদের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ব্যহত হয়। আর নারী দিনমজুর শ্রমিকদের অবস্থা তো আরো বেহাল। তাদের সল্প আয়ের বেশির ভাগ টাকা যদি যাতায়াতে ব্যয় হয়ে যায় তবে তাদের টিকে থাকা দায় হয়।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুারো ও শ্রমশক্তি জরিপের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ৮ লাখ ৪৯ হাজার নারী দিনমজুর শ্রমিক রয়েছেন। শুধু রাজধানীতে প্রায় দুই থেকে আড়াই হাজার নির্মাণ নারী শ্রমিক কাজ করছেন। যারা প্রতিদিন যাতায়াত করেন। এইসব নারী শ্রমিকদের যাতায়াতের ক্ষেত্রে ভয়ানক ভোগান্তি পোহাতে হয়।

৫.
রাজধানীতে বিপুল সংখ্যক মানুষের যাতায়াতের জন্য সকল রুটে সিটিং সার্ভিস চালু করা কোনো সমাধান নয়। প্রতিটা মানুষের আলাদা আলাদা অর্থনৈতিক অবস্থান আছে। যদি সকল লোকাল বাস সার্ভিস বন্ধ করে দিয়ে সিটিং বাস সার্ভিস চালু করা হয় তবে সাধারণ জনগণ সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হয়। বিপুল সংখ্যক জনগণের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন দ্বিতল বাস সার্ভিস চালু করা। বিআরটিএ’র কিছু বাস চালু থাকলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।

দ্বিতল বাস চালু করলে একদিকে যেমন জনগণের ভোগান্তি কমবে তেমনি যানজট অনেকাংশে কমে যাবে। বিশ্বব্যাংকের তথ্যানুযায়ী শুধু যানজটের কারণে রাজধানী ঢাকায় প্রতিদিন ৩২ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। আর যানজটের কারণে বছরে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়। এই বিশাল অংকের ক্ষতি লাঘব করতে পারলে আরো বেশি মাত্রায় উন্নয়ন করা সম্ভব।

রাজধানীর যাতায়াত ব্যবস্থা বিআরটিএ’র দেখভালের দায়িত্বে থাকলেও তারা এইক্ষেত্রে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। শুধু বিআরটিএ কর্তৃপক্ষই নয় খোদ সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী জনাব ওবায়দুল কাদের কয়েকবার চেষ্টা করেও সিটিং সার্ভিসের দৌরাত্ম্যকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি। সর্বশেষ তিনি সিটিং সার্ভিসকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারার কথা স্বীকার করেন। গোটা দেশ তথা বিশ্ববাসী জেনেছে বিআরটিএ এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রীর ব্যর্থতা।

সাধারণ জনগণ সরকারের এতোসব উন্নয়ন ও সফলতা দৃষ্টান্ত দেখেছে এবং উৎসাহিত হয়েছে। রাজধানীর সিটিং সার্ভিসের ব্যাপারে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রীর ব্যর্থতাকে কেউই সহজভাবে নিতে পারছেন না। তাদের আশা এই ব্যর্থতার অবসান অচিরেই ঘটবে এবং রাজধানীতে যোগাযোগ খাতে সুস্থির হবে।

বিনয় দত্ত
কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক
benoydutta.writer@gmail.com

শেয়ার করুন:
এই বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

ফেসবুকে জার্মানবাংলা২৪

বিজ্ঞাপন

Check for details