1. jashimsarkar@gmail.com : admin :
  2. fatama.ruma007@gmail.com : Fatama Rahman Ruma : Fatama Rahman Ruma
  3. anikbd@germanbangla24.com : Editor : Editor
  4. rafid@germanbangla24.com : rafid :
  5. SaminRahman@germanbangla24.com : Samin Rahman : Samin Rahman

করোনা পরিস্থিতি এবং আমাদের চরিত্র

বিনয় দত্ত
  • প্রকাশের সময়: শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল, ২০২০
বিনয় দত্ত
Check for details

বিনয় দত্ত.

১.
আমরা এমন কেন? প্রশ্নটা নিজেকে। যে জাতির গল্প আমরা সবাইকে বলে বেড়ায়, যে জাতির বীরত্বের কাহিনী সবাইকে শোনায় সেই জাতির আসল রূপ কি এমন? প্রশ্নটা আপনাদের কাছে। এই জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ থেকে শুরু করে আমলা, মন্ত্রী সহ সকলেই আছেন। এই বিশাল জনসংখ্যার দেশের মানুষগুলো আসলে কেমন, এই সংকটে তাদের আসল চরিত্র চেনা যাচ্ছে। সবচেয়ে অবাক করার মতো বিষয় হলো, যে মানুষটি বাংলাদেশকে জন্ম দিয়েছেন তিনি এই জাতি সম্পর্কে বেশ গুরুত্বপূর্ণ মতামত প্রকাশ করেছেন। সেই মতামতটি দেখলেই, আমরা আসলেই কেমন তা পরিষ্কার হয়ে যাবে। বঙ্গববন্ধু তাঁর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বইয়ে লিখেছেন,“আমাদের বাঙালির মধ্যে দুইটা দিক আছে। একটা হল ‘আমরা মুসলমান, আর একটা হল, আমরা বাঙালি।’ পরশ্রীকতরতা এবং বিশ্বাসঘাতকতা আমাদের রক্তের মধ্যে রয়েছে।…
…অনেক সময় দেখা গেছে, একজন অশিক্ষিত লোক লম্বা কাপড়, সুন্দর চেহারা, ভাল দাড়ি, সামান্য আরবি ফার্সি বলতে পারে, বাংলাদেশে এসে পীর হয়ে গেছে। বাঙালি হাজার হাজার টাকা তাকে দিয়েছে একটু দোয়া পাওয়ার লোভে। ভাল করে খবর নিয়ে দেখলে দেখা যাবে এ লোকটা কলকাতার কোন ফলের দোকানের কর্মচারী অথবা ডাকাতি বা খুনের মামলার আসামি। অন্ধ কুসংস্কার ও অলৌকিক বিশ্বাসও বাঙালির দুঃখের আর একটা কারণ।” [পৃ: ৪৭-৪৮]

বঙ্গবন্ধু অনেক আগেই এই জাতির রোগ চিহ্নিত করতে পেরেছিলেন। তিনি তখনই বুঝতে পেরেছেন এই ধর্মান্ধ জাতি নিজেদের স্বার্থের জন্য যে কাউকেই পীর, উজির, নাজির মানতে প্রস্তুত। এই কারণেই যেকোনো ব্যক্তি ধর্মের প্রলেপ মাখিয়ে নিজের মতো যেকোনো কথা বললেই সবাই বিশ্বাস করছে। নিজের বোধ-বুদ্ধি, বিবেচনা দিয়ে তা খতিয়ে দেখছে না। দেশ স্বাধীন হয়েছে ঊনপঞ্চাশ বছর হল। এরপরও আমাদের চরিত্র বদলায়নি। বঙ্গবন্ধুর সেই সময় থেকে ২০২০ এখনো এই জাতি একই রকম আচরণ করছে।

২০২০ সালের ৮ মার্চ বাংলাদেশে প্রথম করোনা আক্রান্ত রোগী শনাক্তের ঘোষণা আসে। এর আগে আমাদের ভূমিকা কি ছিল? তা জানা জরুরী। যেকোনো সংকটে আমরা প্রথমেই দেশের নীতি নির্ধারকদের বক্তব্য শুনতে চাই, কারণ তারা দেশ চালান। দেশের সুবিধা-অসুবিধা দেখবার দায়িত্ব তাদের। দেশের প্রভাবশালী মন্ত্রীরা এই করোনা ভাইরাস নিয়ে যেধরনের প্রহসন বা মিথ্যাচার করেছে তা সত্যিই দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে সময়ের লেখনীতে। বিশেষ করে, স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয় শুরু থেকেই বলছে, করোনা নিয়ে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি আছে। করোনা মোকাবিলা করতে প্রস্তুত সবাই। অথচ এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে যখন মানুষ মারা যাচ্ছে তখন তাদের বক্তব্য একের পর এক পরিবর্তিত হচ্ছে। বের হয়ে আসছে সকল দুর্বলতা।

একজন চিকিৎসক যখন করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীকে দেখতে যাবেন তখন তার যে প্রাথমিক প্রস্তুতি দরকার, সেই প্রস্তুতিই বাংলাদেশের স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয়ের নেই। ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম বা পিপিই পরিধান করে চিকিৎসকরা যে রোগীকে দেখতে যাবেন তার অভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে কয়েকদিনের মধ্যে। ফলে চিকিৎসকরা রোগীকে চিকিৎসা দিয়ে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। কারণ এই ভাইরাস এতো শক্তিশালী যে, যদি একজন চিকিৎসক পিপিই পরিধান না করে রোগীর কাছে যান তাহলে তিনিও আক্রান্ত হতে বাধ্য। আর আক্রান্ত হওয়া মানে মৃত্যু।

এরপর রয়েছে রোগ শনাক্তকরণ কীটের অভাব, রোগীকে বিশেষ যে নিরাপত্তা বেষ্টনীতে সেবা দিবে তাও এখনো প্রস্তুত নয়। এই তথ্য শুধু রাজধানী ঢাকার। ঢাকার বাইরের অবস্থা আরো ভয়ানক।

মানুষের জীবন নিয়ে ছেলেখেলা, এই অধিকার নিশ্চয় স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয়কে দেয়া হয়নি। বাংলাদেশে করোনা ভাইরাসের রোগী চিহ্নিত হয়েছে মার্চের শুরুতে। ২০২০ সালের জানুয়ারিতেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা কৌশল ঠিক করে দিয়েছিল, সতর্কও করেছিল। এই পুরো সময়টাতে স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয় কোনো প্রস্তুতি তো নেইনি। কারণ তারা ভেবেছে, আগে আসুক পরে দেখা যাবে। এই একই ভাবনা ছিল ডেঙ্গু পরিস্থিতির সময়। সেই সময়ের ভয়াবহতা আমাদের জানা।

বাংলাদেশের পরে নেপাল করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। তারা আগে থেকেই আলাদা জায়গায় করোনা রোগীদের সেবা দেওয়ার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নিয়ে ফেলেছে। আর আমাদের অবস্থা আমরা নিজেরাই দেখছি। এই হচ্ছে আমাদের চরিত্র।

২.
বাংলাদেশে ধর্ম বিষয়টা বেশ স্পর্শকাতর জায়গায় আছে। বিষয়টা এমন, ধরবো না, বলবো না এবং নিয়ন্ত্রণও করবো না। এর অর্থ হলো, ধর্মকে তার গতিপথ থেকে লক্ষচ্যুত করার কথা বলা হচ্ছে না বা ধর্ম পালনে বাঁধা দেয়া হচ্ছে না। এই কথার অর্থ হলো, বিভিন্ন সময় বিভিন্ন বক্তারা যা বলছেন তা যেন আমরা নিজের বোধ-বুদ্ধি বিচারে খতিয়ে দেখি। বঙ্গবন্ধুর মতো আমিও বলবো, সে কি কোনো ফলের দোকানের কর্মচারী অথবা ডাকাতি বা খুনের মামলার আসামি তা দেখা জরুরী।

হাঁচি, কাশি, থুথু এরপরে করোনা ভাইরাস ছড়ানোর সবচেয়ে বড় উপসর্গ হলো স্পর্শ। তা স্পর্শকাতর নয়, শুধুই স্পর্শ। অর্থাৎ হাত, মুখ, শরীর ভালোভাবে ধোয়ার পরও জনসমাগম এড়িয়ে চলা বা অন্তরীন হয়ে থাকা বা সর্বোচ্চ নিরাপদ অবস্থানে থাকা। যেখানে সরকার থেকে বার বার বলা হচ্ছে জনসমাগম এড়িয়ে চলুন কারণ আপনি হয়তো নিরাপদে আছেন কিন্তু আপনার পাশের জন যদি কোনো কারণে ভাইরাসে আক্রান্ত হয় তাহলে আপনার শরীরেও এই ভাইরাস আক্রমণ করবে। সেই জায়গায় ওয়াজের বক্তারা মসজিদে নামায পড়বার জন্য সবাইকে জোর দাবী জানাচ্ছে। মসজিদে নামায না পড়লে ঈমান নষ্ট হয়ে যাবে এই ধরনের বিভ্রান্তমূলক তথ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে শুরু করে সব জায়গায় ছড়িয়ে বেড়াচ্ছে। এমনও ঘটনা জানা যায়, কোনো কোনো এলাকায় মাইকে নামায পড়ার জন্য লোকজনদের প্রভাবিত করা হচ্ছে। এতে কি হচ্ছে? এতে করে জনসমাগম বাড়ছে আর করোনা আক্রান্ত হওয়া সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। করোনার কারণে যেখানে সৌদি আরবের মক্কা-মদিনাতে মানুষজনকে আসতে নিষেধ করা হচ্ছে সেই জায়গায় বাংলাদেশে মাইকে ডেকে মসজিদে আসার জন্যে চাপ দেয়া হচ্ছে।
মজার ব্যাপার হলো, এই বিষয়ে কেউই তাদের কিছু বলতে সাহস পাচ্ছে না কারণ আমি শুরুতেই বলেছিলাম, ধর্ম বিষয়টা বেশ স্পর্শকাতর জায়গায় আছে বাংলাদেশে। সবাই ভাবছে তাদের কিছু বললে যদি অনুভূতিতে আঘাত আনা হয়। অনুভূতিতে তখনই আঘাত আসবে যখন মানুষটি জীবিত থাকবে। মৃত মানুষের কাছে অনুভূতির কোন দাম নেই।

এখন এই যে জিদ করা বা কথা না শোনা বা একরোখা আচরণের কারণে আমাদের ভয়ানক মাসুল দিতে হবে। এই চরিত্র থেকে আমাদের বের হয়ে আসতেই হবে।

এখন স্বভাবতই প্রশ্ন আসতে পারে, আপনি কেন বলছেন? আমার যুক্তি সরল। কারো ক্ষতি হোক তা আমি চাই না। সুনির্দিষ্ট কিছু স্বার্থলিপসু মানুষের জন্য বাকিরা মৃত্যু মুখে পতিত হোক তা আমার চাওয়া নয়, তাই আমি বার বার বলি জনসমাগম থেকে বিরত থেকে ধর্ম পালন করা যায়। আমাদের এই মানসিকতা থেকে বের হয়ে আসতেই হবে।

আমাদের চরিত্রের একটা বড় অংশ স্বার্থপরতা। এই স্বার্থপরতার মধ্যে আছে শুধু নিজের ভালো চাওয়া। উত্তরার দিয়াবাড়িতে স্থানীয়রা কোয়ারেন্টিন করার প্রতিবাদ জানিয়েছে, ঢাকার খিলগাঁওয়ের কবরস্থানে স্থানীয় বাসিন্দারা করোনা ভাইরাসের লাশ দাফন করতে দিতে চান না, রাজধানীর তেজগাঁওয়ে আকিজের নিজস্ব দুই বিঘা জমিতে করোনা ভাইরাসের রোগীদের জন্যে হাসপাতাল তৈরি করতে বাঁধা দেন স্থানীয়রা। এগুলো অবশ্য পরে সমাধানও হয়েছে। কিন্তু এই যে আমাদের মানসিকতা, আমাদের স্বার্থপরতার চরিত্র এইটা বড়ই সাংঘাতিক। এইখান থেকে আমরা কখনোই বের হতে পারবো না।

৩.
২০১১ সালে স্টিভেন সোডারবার্গ হলিউডে ‘কন্টাজিওন’ Contagion (2011) নামের একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। এই চলচ্চিত্রটির কথা এখন সকলেরই জানা। চলচ্চিত্রটিতে দেখানো হয়, একজন নারী হংকং থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে আসার পর মারা যায়। সেই নারী হংকং এ থাকাকালীন সময়েই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়। তার সাথে যার যার স্পর্শ হয়েছে, যে জায়গাগুলোতে স্পর্শ হয়েছে সব জায়গায় এই ভাইরাসের জীবাণু ছড়িয়ে পড়ে। ফলে বিভিন্ন দেশের মানুষের মধ্যে এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে দ্রুত। অল্প পরিসরে যেভাবে ভাইরাসের ভয়াবহতা দেখানো হয় তা সত্যিই প্রশংসনীয়। চলচ্চিত্রটিতে মৃত্যুটা এতো বীভৎস দেখানো হয় যা গায়ে কাঁটা দেয়। ‘কন্টাজিওন’ চলচ্চিত্রটি দেখলে করোনা ভাইরাসের ভয়াবহতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। এই ধারণা থেকে আমাদের শিক্ষা নেওয়া জরুরী।

বিশাল জনসংখ্যার এই বাংলাদেশে সমস্যার শেষ নেই। একদিকে যেমন করোনা ভাইরাসের মতো শক্তিশালী ভাইরাস আমাদের গ্রাস করে নিচ্ছে অপরদিকে আমাদের জাতিগত সমস্যা আমাদের আরো বিপদে ঠেলে দিচ্ছে।

যখন এয়ারপোর্ট লকডাউন করার কথা ছিল তখন তা করা হয়নি, অবাদে প্রবেশ করে প্রবাসী বাংলাদেশিরা, এরপর তাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা না করে তাদের ছেড়ে দেওয়া, কি পরিমাণ প্রবাসী দেশে প্রবেশ করেছে তার হিসাব না থাকা, ছেড়ে দেওয়ার পরে তাদের অন্তরীন না হওয়া, বিয়ে থেকে শুরু করে সামাজিক সকল অনুষ্ঠানে যোগদান, বাজারে অসংখ্য মানুষের সাথে আড্ডা দেয়া, পরবর্তীতে তাদের খুঁজে না পাওয়া, প্রবাসী বাংলাদেশিদের অসহযোগিতাপূর্ণ আচরণ, শুরুতেই তাদের মনিটরিং না করা, মন্ত্রীদের গালভরা মিথ্যাচার, স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয়ের বিশাল ব্যর্থতা, বাজারে পণ্যের সংকট তৈরি করে বেশি মুনাফা লাভ, প্রয়োজনের অতিরিক্ত পণ্য কিনে বাসায় মজুদ করা, কোনো পরিকল্পনা ছাড়া ছুটি ঘোষণা করা, নিন্মশ্রেণিপেশার মানুষদের জন্য আলাদা পরিকল্পনা না থাকা, শরীরে করোনা ভাইরাস নিয়ে মিথ্যাচার, ওয়াজের বক্তাদের বিভ্রান্তিমূলক তথ্য ছড়ানো, নিষেধ সত্ত্বেও মসজিদে জনসমাগম, রাজনৈতিক নেতাদের অদূরদর্শীতা, বিত্তশালী প্রতিষ্ঠানগুলোর শুরুতেই এগিয়ে না আসা, বিনোদনের আমেজে ঘুরে বেড়ানো, নিয়ম না মানা, অন্তরীন থাকতে বলার পরও বাসা থেকে বের হওয়া, করোনা মোকাবেলায় বিশেষ মন্ত্রণালয়গুলোর সঠিক পরিকল্পনা না থাকা সহ অসংখ্য কারণে আমরা হয়তো করোনা ভাইরাসের মতো শক্তিশালী ভাইরাসকে মোকাবেলা করতে পারবো না। কিন্তু এই ‘না’ এর পিছনে লুকিয়ে আছে বেঁচে থাকার সত্যিকারের সম্ভাবনা। যদি আমরা সচেতন হয়, নিজের পরিবার এবং অন্যদের সচেতন করি তাহলেই আমরা এই ভয়ানক মহামারী ভাইরাস মোকাবেলা করতে পারবো। না হয় আমাদের ব্যর্থতা নতুন ইতিহাসের জন্ম দিবে।

বিনয় দত্ত
কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক
benoydutta.writer@gmail.com

শেয়ার করুন:
এই বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

ফেসবুকে জার্মানবাংলা২৪

বিজ্ঞাপন

Check for details