অসাম্প্রদায়িক দেশ গড়ার দায়িত্ব আমাদেরই

Check for details

বিনয় দত্ত

১.
একাত্তরে দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী মুক্তিসংগ্রামের পর আমরা বাংলাদেশ নামক একটি স্বাধীন দেশ পেয়েছি। এই দেশটিকে স্বাধীন অসংখ্য অসংখ্য মানুষের অবদান আছে যা বলে শেষ করা যাবে না। এই স্বাধীন দেশটির জনগণ এখন নিজেদের মাতৃভাষা ‘বাংলা’য় কথা বলতে পারছে, নিজেদের সংস্কৃতি পালন করতে পারছে। সবচেয়ে বড় কথা হল নিজেরা স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারছে, ঘুরাঘুরি করতে পারছে। নিজেদের স্বাধীনতা পূর্ণভাবে উপভোগ করতে পারছে।
স্বাধীনতার ৪৭ বছর পেরিয়ে ৪৮ বছরে পা দিলাম আমরা। অনেক প্রতিকুলতা, অনেক বাঁধার মধ্যে আমরা এই পর্যন্ত এগিয়ে এসেছি। এখন বিশ্বের দুয়ারে ‘বাংলাদেশ’ শুধু একটি নামই নয়। বাংলাদেশ এখন ঘুরে দাঁড়ানোর অনন্য উদাহরণ। আর্থ সামাজিক প্রেক্ষাপটে আমাদের অবস্থান বিশ্ব দরবারে প্রশংসনীয়। বাংলাদেশের উন্নয়ন এখন দেখার মতো। আমাদের বর্তমান জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৭.৮৬ শতাংশ। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ চার গুণের বেশি বেড়ে এখন ৩২ দশমিক ৯৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছে। আমাদের মাথাপিছু আয় দাঁড়িয়েছে এখন ১৭৫১ ডলারে। আমাদের দেশের ঔষুধ এখন যুক্তরাষ্ট্রসহ ১৭০টি দেশে রপ্তানি হচ্ছে। আমরা দারিদ্র্যের হার অনেকাংশে কমিয়ে এনেছি। রপ্তানি, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন ও কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণসহ সব ক্ষেত্রে দিন দিনই উন্নতি হচ্ছে। ২০৩০ সালের মধ্যে আমাদের লক্ষ্য মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়া। আমাদের গার্মেন্টস, লেদার, সিরামিক, সবজি, দেশীয় ফল সহ অনেক পণ্যই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে। রপ্তানিমুখী শিল্পনির্ভর দ্রুত অগ্রসরমাণ এক অর্থনীতির নাম বাংলাদেশ।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সাফল্য অপেক্ষা করছে সামনে। ৬.১৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য এবং ৭২ ফুট প্রস্থের বিশাল পদ্মা সেতু নির্মিত হচ্ছে দেশীয় অর্থায়নে। যে সেতু নির্মাণে বড় বড় দুটি দাতা সংস্থা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে সেই সেতুর পুরোটাই নির্মিত হচ্ছে আমাদের দেশের টাকা দিয়ে। দ্বিতলবিশিষ্ট এই সেতু নির্মিত হবে কংক্রিট আর স্টিল দিয়ে। যার ওপর দিয়ে যানবাহন আর নিচে দিয়ে ট্রেন চলবে। এই সেতু নির্মাণের পর বিশ্বের বুকে বাংলাদেশের নাম আরো গর্বের সাথে উচ্চারিত হবে।
যেই দেশকে ১৯৭১ সালে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার ‘ইন্টারন্যাশনাল বাস্কেট কেস’ অর্থাৎ তলাবিহীন ঝুড়ি বলেছিলেন সেই দেশ প্রায় ত্রিশ হাজার কোটি ব্যয়ে পদ্মা সেতু নির্মাণ করতে যাচ্ছে। সেই দেশ ২০১৪ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কাছ থেকে পোলিওমুক্ত দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। সেই দেশ শিশু মৃত্যুর হার কমিয়ে জাতিসংঘের স্বীকৃতি অর্জন করেছে। নারী শিক্ষায় অগ্রগতি ঘটিয়েছে, নারীর ক্ষমতায়নে বিশ্বের কাছে রোল মডেলে পরিণত হয়েছে। এখন বড় বড় দুর্যোগ মোকাবেলায় আমাদের বৈদেশিক ত্রাণের জন্য বসে থাকতে হয় না।
চারুকলার মঙ্গল শোভাযাত্রা, বাংলাদেশের শীতল পাটি এবং জামদানী শাড়ি এখন বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ। জাতিসংঘের সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো আমাদের মঙ্গল শোভাযাত্রাকে ‘রিপ্রেজেনটেটিভ লিস্ট অব ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ অব হিউম্যানিটি’র তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে।
বাংলাদেশের প্রথম ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে আমাদের জামদানি শাড়ি নিবন্ধিত হয়েছে এবং বাংলাদেশের বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী শীতলপাটির বয়নশিল্পকে ইউনেস্কো ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ আন্তর্জাতিক ঐতিহ্যের তালিকায় স্বীকৃতি দিয়েছে। এছাড়াও একাত্তরের ৭ মার্চ যে ভাষণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালির স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন, সেই ভাষণ ‘বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য’ হিসেবে ইউনেস্কোর ‘মেমোরি অফ দা ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্টারে’ যুক্ত হয়েছে।
এখন আমাদের দেশের তরুণরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সাফল্য অর্জন করে বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করছে। শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি, চলচ্চিত্র, খেলাধুলা সকল ক্ষেত্রে বাংলাদেশ একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এখন আর আলাদা করে বাংলাদেশকে চেনাতে হয় না। নাম বললেই সবাই বাংলাদেশ সম্পর্কে জানে। এই হচ্ছে আমাদের অর্জন। এই সমগ্র উন্নয়ন বাংলাদেশের, এদেশের প্রতিটি জনগণের।

২.
আমি প্রায়শই ভাবি বাংলাদেশের এতো উন্নয়ন, এতো অগ্রযাত্রা যদি বাংলাদেশের না হত তবে কি হত? ব্যাপারটা একটু খটকা মনে হলেও পরিষ্কার করি বলি। যদি আমাদের দেশ স্বাধীন না হয়ে এখনো পাকিস্তানের অধীনে নির্যাতিত হত, যদি এখনো পাকিস্তানিরা আমাদের প্রতিটি ক্ষেত্রে অত্যাচার করে একঘরে করে রাখতো, যদি পাকিস্তানিরা এখনো আমাদের সংস্কৃতিকে কড়াল গ্রাসের কবলে ফেলে আমাদের বঞ্চণার শিকার করতো, তবে কি হত?
হয়তো এখনো আমরা পাকিস্তানি সামরিক শাসনের যাতাকলে পিষ্ট হয়ে নিজেদের জীবন দিতাম। হয়তো এই সকল অর্জন, অগ্রযাত্রা থেমে যেত। হয়তো এখন মতিউর রহমান নিজামী, কাদের মোল্লা, মুহাম্মদ কামারুজ্জামান, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ কিংবা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর মতো দুর্ধর্ষ মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধীরা ক্ষমতার বীরদর্পে ঘুরে বেড়াত এবং অন্যায়ভাবে ক্ষমতা ব্যবহার করে হয়তো মুক্তিযোদ্ধাসহ সকল বাংলাদেশপ্রেমীদের হত্যা করতো। কিন্তু তা হয়নি।
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মতো একজন মহান নেতা আমাদের এই ভূমিতে জন্ম নিয়েছেন এবং স্বাধীনতার ডাক দিয়েছেন। সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী এবং এএইচএম কামরুজ্জামানের মতো জাতীয় চার নেতা এই বাংলাদেশে জন্ম নিয়েছেন। অসংখ্য তরুণ উদ্যমী যোদ্ধারা মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে দেশ স্বাধীন করেছেন। ত্রিশ লক্ষ বাঙালি তাদের প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন এবং আমাদের দুই লাখ মা-বোন ইজ্জত হারিয়েছেন। এই রকম আরো অসংখ্য অসংখ্য অবদানের জন্য আমরা আজকে বাংলাদেশ নামের এই স্বাধীন দেশটি পেয়েছি।

৩.
আমাদের দেশের এতোসব উন্নয়ন এবং অগ্রযাত্রার মধ্যে সবচেয়ে বড় হতাশার বিষয় হল, দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিসংগ্রামে যে দেশটি আমরা পেয়েছি, এই দেশটিকে স্বাধীন করার জন্য যেসব মুক্তিযোদ্ধা সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ করেছেন তাদের সঠিক পূর্ণাঙ্গ তালিকা আমরা এখনো করতে পারিনি। যে বুদ্ধিজীবীরা দেশের সূর্যসন্তান তাদের আমরা হারিয়েছি। এখনো পর্যন্ত সকল বুদ্ধিজীবীদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা আমরা প্রকাশ করতে পারেনি। যে ত্রিশ লক্ষ বাঙালি তাদের প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন তাদের একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা করা যেত আমরা তাও করতে পারিনি। যেসব মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধীরা আমাদের দেশটি চাইনি এবং যারা শুরু থেকে বাংলাদেশের জন্মের বিরোধিতা করেছে তাদের সুস্পষ্ট কোনো তালিকা আমরা এখনো করতে পারিনি।
উচিত ছিল এইসকল তালিকা প্রণয়ণ করে গোটা জাতিকে দেখানো তথা গোটা বিশ্বকে দেখানো যে, আমাদের বাংলাদেশ স্বাধীন হতে এতো মানুষের প্রাণ বিসর্জন হয়েছে। দেশের সূর্যসন্তানদের হত্যা করা হয়েছে। এই বিশাল সংখ্যক মুক্তিযোদ্ধারা সন্মুখ যুদ্ধ করেছেন এবং এইসব লোক যারা বাংলাদেশের সবকিছু গ্রহণ করে কিন্তু নিজেদের কখনোই বাঙালি, বাংলাদেশি মনে করে না তারা বাংলাদেশের জন্মের বিরোধিতা করেছে। এই পুরো তালিকা যুগের পর যুগ সবাই দেখবে। তরুণ প্রজন্ম তাদের চিনবে, তাদের সম্পর্কে জানবে এবং মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি অগাধ ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন করবে, এইটাই হওয়া উচিত ছিল।
আমাদের পাঠ্যক্রমে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস, মুক্তিযোদ্ধাদের ইতিহাস, বীরাঙ্গনাদের ইতিহাস অবশ্যই যুক্ত করা উচিত ছিল। শুধু তাই নয় মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধীদের পূর্ণাঙ্গ নাম, তালিকা, কর্মকাণ্ড সবকিছু সকলকে জানানোর জন্য এবং তাদের চিহ্নিত করার জন্য সরকারের উচিত ছিল সকল পাঠ্যক্রমে তা যুক্ত করে দেয়া। শুধু তাই নয়, শিশু শ্রেণি থেকে শুরু করে বিসিএস শিক্ষাকার্যক্রমে সঠিক ইতিহাস তুলে ধরা উচিত ছিল।
এই কাজটি সঠিক সময়ে করা হয়নি দেখে এখন অমুক্তিযোদ্ধারা মুক্তিযোদ্ধাদের মূল তালিকায় ঢুকে পড়েছে এবং সরকারি সকল সুযোগ সুবিধা গ্রহণ করছে। দেশবিরোধীরা বিভিন্ন পরিকল্পনার মাধ্যমে এখনো পিছন থেকে দেশের ভিতরে আঘাত হানছে তথা বাংলাদেশের সুনাম ক্ষুণ্ণ করছে। যদি মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধীদের সঠিক তালিকা করা যেত তবে আমাদের মধ্যে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়াতো না তথা অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়তে পারতাম। জাতীয়তাবোধ, দেশপ্রেমে আমরা উদ্বুদ্ধ হতাম। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কাছে আমাদের দেশ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকতো।
তরুণ প্রজন্ম এখন বিভ্রান্ত হয়ে পড়ছে ইতিহাস বিকৃতির কারণে। একেক রাজনৈতিক দল নিজেদের মনমতো ইতিহাসকে চালিত করছে। উচিত ছিল আমাদের জাতির জন্য, নতুন প্রজন্মের জন্য ইতিহাসকে সঠিক রাখা, তাতে আগামী প্রজন্ম যেমন দেশের প্রতি গৌরববোধ করতো তেমনি বাইরের কোনো শক্তি এসে আমাদের অসাম্প্রদায়িক চেতনার বাংলাদেশকে আঘাত করতে পারতো না।

বিনয় দত্ত
সাহিত্যিক ও সাংবাদিক
benoydutta.writer@gmail.com

Facebook Comments